যাদের হামলায় ইরানের বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, নিহত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ নেতা-সেই যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার সম্ভাবনা আগের দিন উড়িয়ে দেন ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমেদ দোনিয়ামালি। ফলে বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর মাত্র মাস তিনেক বাকি থাকতে তাদের জায়গায় এখন নতুন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার পক্ষ থেকে অবশ্য এখনও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এখনও। তবে ভীষণ জটিল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ফিফার কর্তাদের অবশ্যই এখনই ইরানের সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানে অতর্কিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা প্রাণ হারান। সেই থেকে প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলসহ আশেপাশে দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ থামার কোনো আভাস এখনও মেলেনি। মূলত এই সংঘাত শুরুর পর থেকেই আগামী জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় জাগতে শুরু করে।
অবশ্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যেন আশায় আছেন, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ নেবে ইরান জাতীয় দল। তিনি বুধবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, বিশ্বকাপে ইরান দলকে স্বাগত জানাবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে দিনশেষে যদি ইতিবাচক কিছু না ঘটে, ইরান সত্যিই যদি সরে দাঁড়ায় বিশ্বকাপ থেকে, তাহলে কী হবে? আধুনিক ফুটবলে এমন কোনো ঘটনার উদাহরণ নেই, তাই উত্তর পাওয়া মুশকিল।
ফিফার সাবেক ফুটবল রেগুলেটরির পরিচালক জেমস কিচিংও রয়টার্সকে তেমনটাই বলেছেন। “ফুটবলের আধুনিক যুগে এমন ঘটনার নজির নেই। ফিফার টুর্নামেন্ট আইন অনুযায়ী, কোনো দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ালে তাদের জায়গায় ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে সংস্থাটির।”
“এর অর্থ হলো, উদাহরণস্বরূপ কোনো দল সরে দাঁড়ালে তাদের জায়গায় একই কনফেডারেশন থেকেই আরেক দল আনতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আবার এমনও নয় যে, তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ করতেই হবে।” কিচিংয়ের মতে, কোনো দল বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে ওই দেশের ফুটবল সংস্থাকে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে ফিফা।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান বিশ্বকাপ না খেললেও, ফিফা তাদেরকে কোনো শাস্তি দেবে না বলেই মনে করেন সাবেক এই ফুটবল কর্মকর্তা। গত বছর এশিয়া অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের বাধা উতরে টানা চতুর্থবারের মতো মূল পর্বে জায়গা করে নেয় ইরান।
আগামী ১৫ জুন নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর কথা তাদের। ‘জি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম ও মিশর। এখন তারা যদি সত্যিই না খেলে ৪৮ দলের বিশ্বকাপে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই মহাদেশ থেকেই নতুন আরেকটি দলকে আনা উচিত বলে ধারণা অনেকের। ফিফার আইনে এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, এটাই যৌক্তিক মনে করেন অনেকে। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে দুটি নাম-ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এই মাসের শেষ সপ্তাহে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে খেলবে ইরাক। আর গত বছর নভেম্বরে এশিয়া অঞ্চলের বাছাইয়ে এলিমিনেটর রাউন্ডে ইরাকের বিপক্ষে হেরেই আশা শেষ হয়ে যায় আরব আমিরাতের। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখানে বিমান চলাচল খুব সীমিত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ইরাক জাতীয় দলের মেক্সিকোয় ভ্রমণ করা এবং প্রস্তুতি নেওয়া খুবই কঠিন। আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের বাধা পেরিয়ে দুটি দল বিশ্বকাপে উঠবে। এর দ্বিতীয়টির সেমি-ফাইনালে মুখোমুখি হবে বলিভিয়া ও সুরিনাম। তাদের মধ্যে বিজয়ীর বিপক্ষে আগামী ৩১ মার্চ খেলবে ইরাক।
ইরাকের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড ফিফাকে একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, তাদের ৩১ মার্চের সম্ভাব্য ম্যাচটি আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। “বলিভিয়া ও সুরিনামের ম্যাচটি এই মাসেই হোক এবং এরপর বিশ্বকাপের এক সপ্তাহ আগে ওই ম্যাচের বিজয়ীর বিপক্ষে আমরা খেলব যুক্তরাষ্ট্রে-সেই ম্যাচের বিজয়ীরা থাকবে এবং পরাজিতরা বাড়ি ফিরে যাবে।” “আমার মতে, এতে ফিফাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বেশি সময় পাবে ইরানের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে। ইরান যদি সরে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা বিশ্বকাপে খেলব এবং এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটা সুযোগ পাবে বলিভিয়া কিংবা সুরিনামের বিপক্ষে খেলার প্রস্তুতি নেওয়ার।”
ডিসি/আপ্র/ ১২/৩/২০২৬