যশোরে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমেই দেশে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে। এখন সময় দেশ গঠন ও জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনে কাজ করার।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গোষ্ঠী দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং সরকারের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। নির্বাচনের সময় ‘বায়বীয় টিকিট’ বিক্রির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জনগণ এসব বিভ্রান্তিতে সাড়া দেয়নি। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিশ্রম করতে হবে। পরিশ্রমী জাতিকেই আল্লাহ সহায়তা করেন—এই বিশ্বাস নিয়ে দেশ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান দাবি করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ ধানের শীষ প্রতীকে সমর্থন দিয়ে বিএনপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। তিনি বলেন, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, বেকারদের কর্মসংস্থান এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য জনগণ বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে একটি মহল এই ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং বিএনপিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কারা প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করছে—তা জনগণই বিচার করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্টে যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে বিএনপি শুরু থেকেই অবস্থান নিয়েছে। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস—এই নীতিতে বিএনপি বিশ্বাস করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, মা-বোনদের শিক্ষা, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি শিশুর কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীরা জনগণের অধিকার আদায়ে রাজপথে জীবন দিয়েছেন। যশোর জেলাতেই ৬৮ জন নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের মতোই একটি মহল আবারও দেশকে পিছিয়ে দিতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জনগণ যাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তারাই দেশ পরিচালনা করবে—এটাই গণতন্ত্রের মূল কথা। বিএনপি সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে কাজ করবে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
মেয়েদের শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, আসছে এলপিজি কার্ড: মেয়েদের শিক্ষাকে আরো বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ‘ডিগ্রি পর্যন্ত’ অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা সহজ করতে চালু হচ্ছে ‘এলপিজি কার্ড’-যার মাধ্যমে রান্নাবান্নার কষ্ট লাঘবের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার যশোরের শার্শা উপজেলার খুলশী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে এসব ঘোষণা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী; তাদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে প্রথমে স্কুল পর্যায়ে এবং পরে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে সরকার এখন ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “শুধু অবৈতনিক শিক্ষাই নয়, যারা ভালো ফলাফল করবে তাদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থাও থাকবে, যাতে তারা উচ্চতর শিক্ষায় এগিয়ে যেতে পারে।”
যদিও বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে মেয়েদের জন্য স্নাতকোত্তর এবং ছেলেদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল, বর্তমান ঘোষণায় মেয়েদের ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
নারীর ক্ষমতায়নে ‘এলপিজি কার্ড’: নারীদের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও নতুন উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য চালু হওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে পরিবার পরিচালনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র আয়ের উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব।
এর ধারাবাহিকতায় সরকার ‘এলপিজি কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের কাছে এলপিজি গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে রান্নাবান্নার কষ্ট কমে এবং জীবনযাত্রা সহজ হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গ্রাম হোক বা শহর-রান্নাবান্নার কষ্ট সবারই। আমরা চাই মা-বোনদের সেই কষ্ট লাঘব করতে।”
‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা’ নিয়ে সতর্কবার্তা: সমাবেশে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু মহল ‘জুলাই সনদ’-এর অর্থ বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে এবং এর মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়।
তিনি বলেন, “যারা গণভোটের রায়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চায়, তারা দেশের উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো ব্যাহত করতে চায়।”
এ ধরনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিভ্রান্তি ও অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রয়াস দেখা গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
পুনঃখননে ফিরবে খালের প্রাণ: এদিন প্রায় পাঁচ দশক আগে শুরু হওয়া একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় যশোরের উলশী খাল পুনঃখননের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে তিনি এ কর্মসূচির সূচনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালটি ভরাট ও দখলের কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে, যার ফলে কৃষক ও স্থানীয় জনগণ বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল পুনঃখনন করা গেলে প্রায় ২০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং অতিরিক্ত প্রায় ১৪০০ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রায় ৭২ হাজার মানুষ এর সুফল পাবে।
তিনি আরো জানান, খাল পুনঃখনন শেষে এর দুই পাশে প্রায় তিন হাজার গাছ রোপণ করা হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। খালে পানি ফিরে এলে হাঁস পালনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিশেষ করে নারীদের জন্য বাড়তি আয়ের পথ খুলে দেবে।
সমাবেশে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও শ্রমের মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করা যাবে।
সানা/আপ্র/২৭/৪/২০২৬