রাজধানীর দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ মামলায় ১ নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার অন্য তিনজন হলেন মামুন, আসলাম ও মুন্না।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন চারজনকে গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হক জানান, শাহরিয়ার মাহমুদকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তার বিস্তারিত পরিচয় জানানো হয়নি।
গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইসিবি চত্বর এলাকার নিউ গিনি প্রপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও ছাড়াও আবাসন প্রকল্পের কার্যালয় ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে এলাকার অন্য জমির মালিকদের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, ওই জমিতে নিউ গিনি প্রপার্টিজ একটি গেট নির্মাণ করে অন্যদের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন সেখানে যায় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এ ঘটনায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এজাহারে ১৩ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরো ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় নাম থাকা আসামিরা হলেন- গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, শাহরিয়ার মাহমুদ, আবুল কাশেম, বাবুল হোসেন, মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান, মতিউর রহমান, মজিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, এমকে আজাদ, মামুন, আসলাম ও মুন্না।
বাদীর অভিযোগ, জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে আসামিরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকল্পে প্রবেশ করে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং প্রকৌশলী ও নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করেন।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২৬ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টা ২০ মিনিটে ১ নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদের ইন্ধন ও নির্দেশে অন্য আসামিরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করেন। তাদের হাতে শটগান, রিভলবার, চাপাতি, রামদা, ছোরা, রড ও লাঠিসোঁটা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রায় ৫০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। প্রকল্পের শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীরা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করলে বাদী নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেন।
এজাহারে আরো বলা হয়েছে, হামলাকারীরা সাইট প্রকৌশলী মো. পারভেজকে মারধর করে আহত করেন। ২ নম্বর আসামি আবুল কাশেম রিভলবারের মাথা দিয়ে পারভেজের মাথায় আঘাত করেন। পারভেজকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে নিরাপত্তাকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলামকেও মারধর করা হয়।
বাদীর অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রকল্পের মূল ফটকে প্রায় ১০ রাউন্ড গুলি করেন। পরে লোহার গেট, থাই গ্লাস ও কাচের গেট ভাঙচুর করে অফিসকক্ষে ঢোকেন। সেখানে লকার ভেঙে নির্মাণসামগ্রী কেনার জন্য রাখা ২৫ লাখ টাকা লুট করা হয়েছে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়। হার্ডডিস্কসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগও রয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া মামুনের বাড়ি গফরগাঁও; তিনি ভাসানটেক বস্তিতে থাকেন। আসলামের বাড়ি টাঙ্গাইল এবং তিনি অটোরিকশা চালান। মুন্নাও ভাসানটেক বস্তিতে থাকেন।
হামলার পর সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেন, দুই ট্রাকে করে লোকজন এসে তাঁর স্টুডিওতে হামলা চালায়। রাত পৌনে ২টার দিকে স্টুডিওর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারে এসে তিনি বলেন, হামলায় পুরো স্টুডিও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি দাবি করেন, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য হয়তো ভবনের মালিক ছিলেন এবং তাঁর কাছেও চাঁদা দাবি করা হয়ে থাকতে পারে।
সালমান আরো অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙার পাশাপাশি সার্ভার নিয়ে গেছে। হামলাকারীদের কেউ কেউ বিএনপির নাম বলেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তাঁর এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে অভিযোগ করলেও তিনি মামলা করেছেন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, ওই লাইভ থেকেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, সালমান ঢালাওভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন।
এর জবাবে সালমান বলেন, হামলার পর রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় যান এবং পরদিন ভোর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তাঁর দাবি, ওই সময়ও তাঁর মামলা নেওয়া হয়নি। একজন নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের উল্লেখ করে তিনি ঘটনার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় তদন্ত চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সানা/আপ্র/২৭/৯/২০২৬