সংযম, ক্ষমা আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু এ বছরের ঈদের সকালেও সেই খুশির ভেতর স্পষ্ট হয়ে উঠল এক গভীর বেদনা। রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহে প্রধান ঈদ জামাত শেষে হাজারো মুসল্লির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো একটাই আকুতি—যুদ্ধ বন্ধ হোক, রক্তপাত থামুক, শান্তি ফিরুক মুসলিম বিশ্বে।
শনিবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে আটটায় সুপ্রিম কোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। নামাজ শেষে খুতবা ও মোনাজাতে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের পাশাপাশি সারা বিশ্বের ফিতনা-ফ্যাসাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও নির্যাতন থেকে মানুষের মুক্তি কামনা করা হয়। ইমামের দোয়ায় তখন ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে একাত্ম হন হাজারো মুসল্লি।
মোনাজাতে মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, বিশ্বের মানুষকে যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হোক, মজলুমদের রক্ষা করা হোক, জালিমদের জুলুম বন্ধ হোক এবং মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও শক্তি সৃষ্টি হোক, যাতে তারা সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে পারে। অসহায় ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে মুসলিম দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।
ঈদের এই মোনাজাতে যুদ্ধ বন্ধের আকুতি হঠাৎ করে আসেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যে ভয়াবহ সংঘাত শুরু হয়েছে, তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে গোটা অঞ্চলে। পাল্টাপাল্টি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাতে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মুসলিমপ্রধান বহু দেশ; ম্লান হয়ে গেছে কোটি কোটি মানুষের ঈদ-উৎসবও।
এই সংঘাতের ধাক্কা বাংলাদেশেও এসে পৌঁছেছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, তেল-গ্যাস সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং প্রবাসী আয়ের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও দুশ্চিন্তা ঘনীভূত। যুদ্ধপীড়িত অঞ্চলগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। ইরানে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ যেমন নিতে হয়েছে, তেমনি উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বহু প্রবাসীর পরিবারও দিন কাটাচ্ছে গভীর উদ্বেগে। সেই বাস্তবতাই যেন প্রতিফলিত হলো জাতীয় ঈদগাহের মোনাজাতে।
ঈদগাহে আসা এক মুসল্লির হাতে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানসংবলিত প্ল্যাকার্ডও চোখে পড়ে। সেটি ছিল সময়ের বেদনার এক নীরব কিন্তু তীব্র ভাষ্য। ঈদের নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু নিজেদের জীবনের শান্তিই চাননি, চেয়েছেন রক্তাক্ত ভূখণ্ডে নিরাপত্তা, ধ্বংসস্তূপে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য স্বস্তি, আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো স্বজনদের জন্য আশ্রয়।
এবারের প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একসঙ্গে অংশ নেন। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ঈদের প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে একসঙ্গে দেখা গেল। নামাজ শেষে তাঁরা কোলাকুলি করেন। প্রধানমন্ত্রী পরে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধান জামাতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি, বিচারপতিরা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ।
সকাল থেকেই কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে জাতীয় ঈদগাহে প্রবেশ করেন মুসল্লিরা। নির্ধারিত সময়ের আগেই মূল প্যান্ডেল পূর্ণ হয়ে যায়। অনেকে ভেতরে জায়গা না পেয়ে আশপাশের সড়কেও নামাজ আদায় করেন। মূল প্যান্ডেলে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা ছিল। আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গাসহ প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ রাখা হয়। নারীদের জন্যও ছিল আলাদা প্রবেশপথ, অজুখানা ও নামাজের ব্যবস্থা।
ঈদের সকাল সাধারণত মিলন, ভ্রাতৃত্ব আর আনন্দের প্রতীক। কিন্তু এ বছরের ঈদে জাতীয় ঈদগাহের মোনাজাত যেন স্মরণ করিয়ে দিল, পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ জ্বললে অন্য প্রান্তের হৃদয়ও শান্ত থাকে না। খুশির এই দিনেও তাই মানুষের কণ্ঠে সবচেয়ে প্রবল হয়ে উঠল মানবতার ডাক—যুদ্ধ থামুক, মানুষ বাঁচুক, শান্তি ফিরুক পৃথিবীতে।
সানা/আপ্র/২১/৩/২০২৬