যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে চীনের চারটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমা স্পষ্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং। তাইওয়ান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, চীনের উন্নয়নের পথ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং উন্নয়নের অধিকার-এই চার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ না জানানোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে শিয়ে ফেং বলেন, চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ লঙ্ঘন করা যাবে না। দুই দেশের মতপার্থক্য ও বিরোধ সদিচ্ছার মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর ঘোষিত চারটি ‘রেড লাইন’ হলো - তাইওয়ান; গণতন্ত্র ও মানবাধিকার; চীনের নিজস্ব উন্নয়নের পথ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা; এবং উন্নয়নের অধিকার। চীনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বা চাপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিয়ে ফেং বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো বিষয়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে চীনকে দমন বা আটকে রাখার চেষ্টা বন্ধ করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। তাঁর ভাষায়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করলে উভয় দেশই লাভবান হয়, আর মুখোমুখি অবস্থানে গেলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও একই ধরনের পথ অনুসরণের প্রত্যাশা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
এর মধ্যেই বুধবার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন শি জিনপিং। সফরে তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এক দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে এটি শির প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর দুই নেতার এটি তৃতীয় বৈঠক।
দুই নেতার বৈঠকে বাণিজ্য ও শুল্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, বিরল মৃত্তিকা খনিজসহ দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বিষয়ও আলোচনায় উঠতে পারে।
তাইওয়ান নিয়ে মতবিরোধ দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার ও অস্ত্র সরবরাহকারী। ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন অস্ত্র প্যাকেজ আটকে রেখেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। শি জিনপিং বৈঠকে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ বা সীমিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে।
বাণিজ্যও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত বছর দুই দেশ শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত উত্তেজনা কমাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের চাপ কিছুটা কমানো এবং চীনের বিরল মৃত্তিকা খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এবার সেই সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরো স্থিতিশীল করার চেষ্টা থাকবে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের প্রতিযোগিতা তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, চিপ ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই নেতার আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে শি জিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় আয়োজন করা হয়েছে। ট্রাম্প নিজে বিমানঘাঁটিতে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছেন। এরপর রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এটিকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে শির সফরকে ঘিরে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব প্রদর্শনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের বার্তা স্পষ্ট - বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ থাকলেও তাইওয়ান, মানবাধিকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং চীনের উন্নয়নের অধিকারকে দর-কষাকষির সাধারণ বিষয় হিসেবে দেখতে রাজি নয় চীন। ফলে বৈঠকে দুই নেতার আলোচনার পাশাপাশি কোন বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয় এবং কোন বিষয়ে মতপার্থক্য বহাল থাকে, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
সানা/আপ্র/২৪/৯/২০২৬