যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকেরা এমন এক নতুন রোবট তৈরি করেছেন, যা একই সঙ্গে আকাশে উড়তে এবং পানির নিচে সাঁতার কাটতে পারে। মাত্র ৩০০ ডলার ব্যয়ে তৈরি এই হালকা রোবট ভবিষ্যতে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। খবর সিএনএন।
গবেষকেরা ২৫০ গ্রাম ওজনের একটি ‘ফ্ল্যাপিং এরিয়াল-অ্যাকুয়াটিক ভেহিকল’ বা ডানা ঝাপটানো আকাশ-জলযান তৈরি করেছেন। রোবটটির নাইলনের তৈরি ডানা ও লেজে পানিপ্রতিরোধী ন্যানোকণার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যাতে এটি বাতাস ও পানি-দুই পরিবেশেই কার্যকরভাবে চলাচল করতে পারে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক এবং এমআইটির যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাফায়েল জুফেরি বলেন, ডুবুরি পাখিদের ডানা ও তাদের উড্ডয়ন এবং সাঁতার কাটার পদ্ধতি নিয়ে আগে গবেষণা হলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ চলমান রোবটে রূপ দেওয়ার চেষ্টা সফল হয়নি। তাঁদের দল বিভিন্ন পাখির ডানা ঝাপটানোর গতি, ডানার বিস্তার এবং বাতাস ও পানিতে চলাচলের কৌশল বিশ্লেষণ করে এই নকশা তৈরি করেছে।
গবেষণায় পেট্রেল, পাফিনসহ বিভিন্ন ডুবুরি পাখির শারীরিক গঠন ও আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এসব পাখি একই ডানা ব্যবহার করে বাতাসে উড়ে এবং পানির নিচে এগিয়ে যেতে পারে। গবেষকেরা দেখেছেন, বড় পাখিরা তুলনামূলক কম গতিতে ডানা ঝাপটায়, আর ছোট পাখিদের ডানা ঝাপটানোর গতি বেশি হয়। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই রোবটটির নকশা তৈরি করা হয়েছে।
রাফায়েল জুফেরি বলেন, রোবটটি নিজে বুঝতে পারে না যে সে বাতাসে আছে নাকি পানিতে। এটি এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে, যাতে চারপাশের মাধ্যম যাই হোক না কেন, নির্দিষ্ট গতিতে ডানা ঝাপটাতে থাকে।
বর্তমান সংস্করণের রোবটটি বাতাসে প্রতি সেকেন্ডে ৬ মিটারের বেশি গতিতে উড়তে পারে এবং পানির নিচে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ মিটার গতিতে সাঁতার কাটতে সক্ষম। তাত্ত্বিকভাবে একবার ব্যাটারি চার্জ করলে এটি প্রায় ৬ কিলোমিটার উড়তে এবং ২ কিলোমিটার সাঁতার কাটতে পারবে, যদিও এত দীর্ঘ দূরত্ব এখনো পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা হয়নি।
ম্যাসাচুসেটসের পানির ট্যাংক এবং পরে সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভায় এক বছর ধরে রোবটটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, পানিতে প্রবেশের জন্য প্রায় ৭০ ডিগ্রি কোণ সবচেয়ে কার্যকর। তবে আপাতত এটি কেবল মৃদু ঢেউ ও হালকা বাতাসে কাজ করতে পারে; উত্তাল আবহাওয়ার জন্য উপযোগী নয়।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফি সেন্টারের প্রকৌশলবিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক মাটেন ফারলং এই উদ্ভাবনকে উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলগত সাফল্য বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বাতাস ও পানি-দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘনত্বের মাধ্যমে সমান কার্যকরভাবে চলতে সক্ষম একটি যান তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রোবটকে নির্দিষ্ট রুটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড্ডয়নের জন্য আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা যাবে। এরপর এটি আকাশপথে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পানির নিচে ডুব দেবে, নমুনা সংগ্রহ করবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাবে। ক্ষতিকর শৈবাল আক্রান্ত সমুদ্রাঞ্চল, আগ্নেয়গিরির হ্রদ, হিমশৈলের আশপাশ বা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য এলাকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের রোবট ব্যবহার করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট আকার, কম খরচ এবং দ্বৈত পরিবেশে চলাচলের সক্ষমতার কারণে এই প্রযুক্তি সামুদ্রিক গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ পর্যবেক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬