দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসছে না। চলমান সংক্রমণে মৃত শিশুর সংখ্যা ৮১০ ছাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চলতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবগুলোর একটি এখন বাংলাদেশে। দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৮১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৫ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭১৫ জনের।
একই সময়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৪ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাজার ১৯৪ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ২২ হাজার ১৫০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭১৭ জন রোগী। তাদের মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৫৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সব রোগীর পরীক্ষা সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঢাকায়: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে মৃতের সংখ্যা ৩০৭ জন। এরপর সিলেটে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, ময়মনসিংহে ৬৭, চট্টগ্রামে ৫৬, বরিশালে ৪৩, খুলনায় ৩১ এবং রংপুরে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪টি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা ওই সময়ে বিশ্বের যেকোনো দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংস্থাটি বাংলাদেশের জাতীয় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে উচ্চ এবং আঞ্চলিক ঝুঁকিকে মাঝারি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়া এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন: একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় সফল টিকাদান কর্মসূচির উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে নিশ্চিত হামের রোগী ছিল ২৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ১৩২ জন। দীর্ঘদিনের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে হামজনিত মৃত্যু অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তবে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে দুর্বলতা, টিকা সরবরাহে জটিলতা এবং শিশুদের একটি বড় অংশ টিকার বাইরে থেকে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকার হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সরকারের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত শিশুসংখ্যার তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা কম ছিল। জুন মাসের জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু অংশ নেয়। এ হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হাম-রুবেলা টিকাদানের বাইরে থাকতে পারে।
মৃতদের বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সি: চলমান প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা। মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই এই বয়সি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হামের রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই আগে হামের টিকা নেয়নি।
আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে চিকিৎসা নেওয়া ৩৪১ শিশুর মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল নয় মাসের কম।
চিকিৎসকদের মতে, টিকা না পাওয়া ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হাম থেকে সৃষ্ট নিউমোনিয়াই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা বর্তমান সংকটকে আরো তীব্র করেছে।
তাদের মতে, টিকা সরবরাহ, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করা জরুরি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিয়াজ মোবারক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা। অনেক মা নিজেরাও হামের টিকা না পাওয়ায় নবজাতকেরা প্রয়োজনীয় মাতৃ-অ্যান্টিবডি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি নিয়মিত টিকাদানের আওতা দ্রুত বাড়ানো, রোগ নজরদারি জোরদার, গবেষণা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬
হামে মৃত্যু ৮১০ ছাড়ালো, উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০০:৫৩ পিএম, ২৫ জুলাই ২০২৬
| আপডেট: ০১:৩২ এএম ২০২৬
ফাইল ছবি