ডাঃ বি এম আতিকুজ্জামান
শরীরের একপাশে হঠাৎ জ্বালা, সুচ ফোটার মতো ব্যথা কিংবা কাপড়ের সামান্য স্পর্শেই অসহ্য অনুভূতি। কয়েক দিন পর একই জায়গায় লালচে ফুসকুড়ি ও পানিভরা ফোসকা দেখা দিল। অনেকেই এটিকে অ্যালার্জি, পোকামাকড়ের কামড় বা সাধারণ চর্মরোগ মনে করে অপেক্ষা করেন। কিন্তু এটি হতে পারে শিংগেলস বা হারপিস জোস্টার।
শিংগেলসের ফুসকুড়ি সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে যায়। সমস্যা হলো, কারও কারও ব্যথা তার পরও মাসের পর মাস, এমনকি বছর থেকে যেতে পারে। তাই রোগটিকে শুধু চামড়ার সমস্যা ভাবলে ভুল হবে; এটি মূলত স্নায়ুর রোগ।
চিকেনপক্সের ভাইরাসই ফিরে আসে
শিশু বা বড় বয়সে যাদের চিকেনপক্স হয়েছে, তাদের শরীর থেকে ভাইরাসটি পুরোপুরি বিদায় নেয় না। ভেরিসেলা-জোস্টার নামের ভাইরাসটি স্নায়ুর গোড়ায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় লুকিয়ে থাকে। বহু বছর পর সেটি আবার সক্রিয় হলে শিংগেলস হয়। অর্থাৎ বাইরে থেকে নতুন করে ‘শিংগেলসের জীবাণু’ শরীরে ঢুকতে হয় না।
নিজের শরীরে আগে থেকেই থাকা ভাইরাসই আবার জেগে ওঠে। বয়স বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, ক্যানসার, এইচআইভি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কেমোথেরাপি কিংবা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমায়- এমন ওষুধ ব্যবহারে ঝুঁকি বাড়ে। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষেরও শিংগেলস হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫০ বছরের পর রোগটি বেশি দেখা যায়।
লক্ষণ শুরু হতে পারে ফুসকুড়ির আগেই: শিংগেলসের ব্যথাকে অনেকে আগুনে পোড়া, বিদ্যুতের ঝটকা, চুলকানি বা সুচ ফোটার মতো বলে বর্ণনা করেন। ফুসকুড়ি ওঠার দুই-তিন দিন আগেই ব্যথা শুরু হতে পারে। বুকে হলে হৃদ্রোগ, পেটে হলে পিত্তথলি বা কিডনির ব্যথা, মুখে হলে দাঁতের সমস্যা বলে ভুল হতে পারে।
শিংগেলসের ফুসকুড়ি হয়তো কয়েক সপ্তাহেই মিলিয়ে যাবে। কিন্তু স্নায়ুর ব্যথা অনেক দীর্ঘ হতে পারে। মনে রাখুন, শিংগেলসে অপেক্ষা নয়; দ্রুত চিকিৎসা ব্যথার স্থায়িত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে আর টিকা রোগটি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। এরপর সাধারণত শরীর বা মুখের এক পাশে ফিতার মতো এলাকায় লালচে ফুসকুড়ি ও গুচ্ছ গুচ্ছ ফোসকা ওঠে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি শরীরের মধ্যরেখা অতিক্রম করে দুই পাশে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে না। সঙ্গে জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা পেটের অস্বস্তিও থাকতে পারে।
প্রথম ৭২ ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ: শিংগেলসের চিকিৎসায় ভাইরাসবিরোধী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ফুসকুড়ি ওঠার প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর হয়। এটি রোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব কমাতে এবং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করতে পারে। তাই ‘আরও কয়েক দিন দেখি’ বলে সময় নষ্ট না করে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার দিনই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।
৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে; বিশেষত নতুন ফোসকা উঠতে থাকলে, ব্যথা বেশি হলে, চোখ-কান আক্রান্ত হলে অথবা রোগীর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে।
ভাইরাসবিরোধী ওষুধের পাশাপাশি ব্যথার চিকিৎসাও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ব্যথার ওষুধ কারও জন্য যথেষ্ট হলেও স্নায়ুর ব্যথায় বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। নিজে থেকে স্টেরয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
ফুসকুড়ি শুকালেও ব্যথা কেন থাকে: শিংগেলসের সবচেয়ে পরিচিত জটিলতা হলো পোস্টহারপেটিক নিউরালজিয়া—ফুসকুড়ি সেরে যাওয়ার পরও একই জায়গায় স্নায়ুর ব্যথা থাকা। কাপড়ের স্পর্শ, বাতাস কিংবা গোসলের পানিও তখন অসহ্য লাগতে পারে। ঘুম, ক্ষুধা, কাজকর্ম ও মানসিক স্বাস্থ্যে এর বড় প্রভাব পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) হিসাবে, শিংগেলস হওয়া মানুষের প্রায় ১০ থেকে ১৮ শতাংশের এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি, ব্যথার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব- সবই বাড়ে।
চোখ বা কানের কাছে হলে জরুরি: কপাল, নাকের ডগা, চোখের পাতা বা চোখের চারপাশে ফুসকুড়ি হলে একই দিন চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। চোখ আক্রান্ত হলে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কানের ভেতর বা পাশে ফুসকুড়ির সঙ্গে কানে ব্যথা, শ্রবণশক্তি কমা, মাথা ঘোরা কিংবা মুখের এক পাশ দুর্বল হয়ে গেলেও দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ফুসকুড়ি শরীরের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়া, তীব্র মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট গুরুতর জটিলতার লক্ষণ হতে পারে। রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে অল্প ফুসকুড়িও দ্রুত মূল্যায়ন করা উচিত।
শিংগেলস কি অন্যকে ছড়ায়: শিংগেলস আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য কারও সরাসরি শিংগেলস হয় না। তবে ফোসকার তরলে থাকা ভাইরাস এমন ব্যক্তির শরীরে গেলে- যার আগে চিকেনপক্স হয়নি বা চিকেনপক্সের টিকা নেওয়া নেই, তার চিকেনপক্স হতে পারে।
সব ফোসকা শুকিয়ে খোসা না হওয়া পর্যন্ত ক্ষত ঢেকে রাখতে হবে, হাত নিয়মিত ধুতে হবে এবং ফোসকা চুলকানো এড়িয়ে চলতে হবে। এ সময় গর্ভবতী নারী, নবজাতক এবং রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
টিকা কারা বিবেচনা করবেন: যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নির্দেশনায় ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের দুই ডোজ রিকম্বিন্যান্ট জোস্টার টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রোগ বা চিকিৎসার কারণে রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে গেছে—এমন ১৯ বছর বা তার বেশি বয়সীদেরও দুই ডোজের সুপারিশ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই ডোজের ব্যবধান দুই থেকে ছয় মাস। আগে শিংগেলস হয়ে থাকলেও সুস্থ হওয়ার পর টিকা নেওয়া যায়।
টিকা নেওয়ার পর হাতে ব্যথা, ক্লান্তি, শরীরব্যথা বা সামান্য জ্বর হতে পারে। এগুলো সাধারণত স্বল্পস্থায়ী। চলমান শিংগেলসের চিকিৎসা হিসেবে টিকা দেওয়া হয় না; সক্রিয় অসুস্থতা সেরে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে উপযুক্ত সময় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টিকার প্রাপ্যতা ও জাতীয় নীতি ভিন্ন হতে পারে।
মনে রাখার পাঁচটি কথা হলো-
= শরীরের এক পাশে জ্বালা ও ফোসকা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
= প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাসবিরোধী চিকিৎসা শুরু করা সবচেয়ে ফলপ্রসূ।
= চোখ, নাক, কান বা মুখ আক্রান্ত হলে অপেক্ষা করবেন না।
= ফোসকা ঢেকে রাখুন; গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
= বয়স ৫০ পেরোলে বা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে শিংগেলসের টিকা নিয়ে আলোচনা করুন।
শিংগেলসের ফুসকুড়ি হয়তো কয়েক সপ্তাহেই মিলিয়ে যাবে। কিন্তু স্নায়ুর ব্যথা অনেক দীর্ঘ হতে পারে। মনে রাখুন, শিংগেলসে অপেক্ষা নয়; দ্রুত চিকিৎসা ব্যথার স্থায়িত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। আর টিকা রোগটি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।
শরীরের একপাশে জ্বালা ও ফোসকা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন- প্রথম ৭২ ঘণ্টা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং শিক্ষক, গবেষক, কলামিস্ট ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক
কেএমএএ/আপ্র/২৩.১০.২০২৬