ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, ভিডিও ও তথ্যের মহাসমুদ্রে ডুবে থাকছে মানুষ। বিনোদন, পারস্পরিক যোগাযোগ, শিক্ষা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কাজ- সবকিছুর জন্যই এখন সোশ্যাল মিডিয়া এক অপরিহার্য অংশ। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না- এ প্রশ্ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে।
কল্পনা করুন, আপনি একটি চমৎকার জাদুঘরে ঘুরছেন। প্রতিটি শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে ফোন বের করে ছবি তুলছেন, স্টোরিতে দিচ্ছেন, ক্যাপশন ভাবছেন এবং পরের শিল্পকর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ঘণ্টাখানেক পর জাদুঘর থেকে বেরিয়ে এসে যদি কেউ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, কোন শিল্পকর্মটি আপনার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল, তাহলে উত্তর দিতে গিয়ে আপনাকে রীতিমতো থমকে যেতে হবে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডায়ানা তামিরের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় ঠিক এই বিষয়টিই পরীক্ষা করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশকে টেড টক দেখার সময় বা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সময় ছবি তুলে তা শেয়ার করতে বলা হয়েছিল। আর অন্য অংশকে শুধু অভিজ্ঞতাটি সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করতে বলা হয়েছিল। ফলাফলে স্পষ্ট দেখা গেছে- যারা অভিজ্ঞতা ক্যামেরাবন্দী করে শেয়ার করেছেন, তাদের সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে স্মৃতি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই অস্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য গ্রহণ, ধারণ ও সংরক্ষণের একটি সুনির্দিষ্ট স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু যখন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য চোখের সামনে এসে ভিড় করে, তখন মস্তিষ্ক সব তথ্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে পারে না। ফলে সাধারণ ও প্রয়োজনীয় তথ্যও দীর্ঘক্ষণ মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা: এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন পরীক্ষাগার-ভিত্তিক গবেষণা নয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও একই ধরনের উদ্বেগের চিত্র ধরা পড়েছে। ঋৎড়হঃরবৎং রহ চংুপযরধঃৎু জার্নালে প্রকাশিত একটি বৃহৎ পরিসরের গবেষণায় তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ‘সমস্যাজনক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার’ এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা স্মৃতি বিভ্রাটের মধ্যকার সম্পর্ক গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়। যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দীর্ঘ সময় কাটান, তাদের মধ্যে ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়ার প্রবণতা—যেমন ঘরে কোনো জিনিস কোথায় রাখা হয়েছে বা কাউকে কোনো জরুরি কথা বলার ছিল কি না, তা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ফলাফল অনেকের কাছেই আর বিস্ময়কর ঠেকবে না। যারা নিয়মিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিড স্ক্রল করে সময় কাটান, তারা প্রায়ই আক্ষেপের সুরে বলে ওঠেন- ‘কী যেন দেখছিলাম, মনেই নেই!’ কিংবা ‘এতক্ষণ ধরে ফোনে আসলে কী করলাম, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!’
মস্তিষ্কের ভেতরে আসলে কী ঘটছে: বিশেষজ্ঞ ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এই ঘটনার পেছনে মূলত কয়েকটি প্রধান কারণ বা ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তা হলো-
গুগল এফেক্ট: যখন আমরা নিশ্চিতভাবে জানি- যে কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য দরকার হওয়া মাত্রই ইন্টারনেট সার্চ করে বের করে নেওয়া যাবে, তখন মস্তিষ্ক সেই তথ্য নিজের ভেতরে দীর্ঘকাল ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা কম অনুভব করে। এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বলা হয় ‘ট্রান্স্যাকটিভ মেমরি’ অর্থাৎ আমরা কোন বিষয়টি নিজে মনে রাখব আর কোন বিষয়টি বাহ্যিক কোনো উৎস বা ডিভাইসে (যেমন- স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট) জমা রাখব, এর একটা মানসিক ভাগাভাগি। সোশ্যাল মিডিয়া এই ভাগাভাগিকে এখন এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
মনোযোগের ভাঙন: ফিড স্ক্রল করার সময় একের পর এক ঝলমলে ছবি, আকর্ষণীয় ক্যাপশন, মন্তব্য আর নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ দখল করার জন্য ক্রমাগত প্রতিযোগিতা চালায়। এই নিরন্তর মাল্টিটাস্কিং বা বহুমুখী ব্যস্ততা মস্তিষ্ককে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গভীর মনোযোগ দিতে অক্ষম করে তোলে। আর গভীর মনোযোগ ছাড়া কোনো নতুন তথ্যই দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে জমা হতে পারে না।
ডোপামিনের ফাঁদ: স্ক্রিনের প্রতিটি স্ক্রল বা নতুন নোটিফিকেশনের সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কে সামান্য পরিমাণে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়- যা মস্তিষ্ককে বারবার একই ধরনের আচরণ পুনরাবৃত্তি করতে প্রবলভাবে প্ররোচিত করে। দীর্ঘমেয়াদে এই চক্রটি একধরনের আচরণগত আসক্তি তৈরি করে, যা মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতি ধারণ ক্ষমতা- উভয়কেই দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নির্বাচনী স্মৃতি বিকৃতি: আমরা সচরাচর জীবনের যে মুহূর্তগুলো সোশ্যালে পোস্ট করি, কেবল সেগুলোই বারবার আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে; আর যে মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করা হয় না, সেগুলো ধীরে ধীরে অবচেতন মন থেকে মুছে যায়। ফলে সময়ের পরিক্রমায় আমাদের জীবনের গল্পটা আর সামগ্রিক থাকে না, বরং তা কেবল ক্যামেরায় আটকে থাকা কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের সমষ্টিতে পরিণত হয়।
ডিজিটাল অ্যামনেশিয়া: আধুনিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও এর একটি অন্যতম কারণ। এক সময়ে মানুষ জরুরি ফোন নম্বর, মানুষের ঠিকানা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো নিজেদের মুখস্থ রাখত। বর্তমানে এসবের পুরোটাই স্মার্টফোনের মেমরিতে সংরক্ষিত থাকে। ফলে মস্তিষ্ককে তথ্য মনে রাখার প্রয়োজনীয় মানসিক অনুশীলন আগের তুলনায় অনেক কম করতে হয়।
পুরো দোষটাই কি সোশ্যাল মিডিয়ার: এই পুরো আলোচনায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এসংক্রান্ত বেশিরভাগ গবেষণাই এখনো মূলত সহসম্পর্ক বা পারস্পরিক সংযোগ নির্দেশ করে- সরাসরি নিশ্চিত কোনো কার্যকারণ নয়। অর্থাৎ, এটি এখনো অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয় যে সোশিয়াল মিডিয়াই সরাসরি মানুষের স্মৃতিশক্তি নষ্ট করছে, নাকি যাদের ব্যক্তিগত জীবনেই মনোযোগ ধরে রাখতে কিছুটা সমস্যা হয়, মূলত তারাই বেশি মাত্রায় সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিজ্ঞানীদের মতে, এই দুটি বিষয় সম্ভবত একে অপরকে পারস্পরিকভাবে প্রভাবিত করে- একটি দুষ্টচক্রের মতো, যেখানে দুর্বল মনোযোগ মানুষকে আরও বেশি স্ক্রলিংয়ের দিকে ঠেলে দেয়, আর অতিরিক্ত স্ক্রলিং মনোযোগের ক্ষমতাকে আরও বেশি দুর্বল করে তোলে।
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ফিরে পাওয়ার কার্যকরী উপায়: সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই প্রবণতা মানুষের মস্তিষ্কের কোনো স্থায়ী বা অপূরণীয় ক্ষতি নয়। সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে এটি সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তা হলো জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ এবং সুন্দর মুহূর্তে প্রথমেই ক্যামেরা তাক না করে, নিজের সজাগ চোখ ও মন দিয়ে সেই মুহূর্তটি পুরোপুরি উপভোগ করা; সারা দিনের কাজের ফাঁকে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য ফোন সাইলেন্ট করে দূরে সরিয়ে রাখা; রাতের বেলা ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন বা ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখা- কারণ গভীর ঘুমের সময়ই আমাদের মস্তিষ্ক সারা দিনের সমস্ত স্মৃতি সুবিন্যস্ত ও পাকাপোক্ত করে; এক সঙ্গে একাধিক কাজ বা মাল্টিটাস্কিং পরিহার করে একবারে কেবল একটি নির্দিষ্ট কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা; প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় বা বিরক্তিকর নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, নিয়মিত বই পড়া, শারীরিক ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং পরিবারের মানুষ ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো। সূত্র: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা।
কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৮.২০২৬