গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৯ এএম ২০২৬
শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়
ছবি

ছবি সংগৃৃহীত

যে বয়সে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে, যে সময়ে ভবিষ্যতের সুস্থ, কর্মক্ষম ও মেধাবী নাগরিক তৈরির প্রস্তুতি চলে, সেই বয়সেই যদি অস্বাস্থ্যকর খাবারের অবাধ বিস্তার তাদের খাদ্যাভ্যাসকে বিপথে পরিচালিত করে, তবে তা নিছক জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্যও গুরুতর সতর্কবার্তা। শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় তদারকির অভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। খাদ্যপণ্যের বাজারে মুনাফার প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মূল্য শিশুদের স্বাস্থ্য দিয়ে পরিশোধ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলে পরিচালিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বড় শহরগুলোর প্রতি ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯টির কাছেই রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির দোকান। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের কেনা খাবারের ৭৫ শতাংশের বেশি অস্বাস্থ্যকর। স্কুলের আশপাশে সসেজ রোল, ক্যান্ডি, চিপস ও কোমল পানীয়র সহজলভ্যতা শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচনের পথ সংকুচিত করছে। ডাচ ফুড সেন্টারের প্রতিনিধি লিসবেথ ভেলেমারও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে আমস্টারডাম ইউএমসির গবেষণায় প্রায় ৯৪ শতাংশ মাধ্যমিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। আলমেয়ার, আমস্টারডাম, ডেন বস, লাইডেন, রটারডাম, উট্রেখট, দ্য হেগ, ব্রেডা, গ্রোনিঙ্গেন ও টিলবার্গের দোকান ও খাদ্যপণ্য নিয়ে পরিচালিত গবেষণায়ও স্বাস্থ্যকর খাবারের তুলনায় অস্বাস্থ্যকর খাবারের আধিপত্য দেখা গেছে।

এসব তথ্যের তাৎপর্য গভীর। শিশুদের খাদ্যাভ্যাস কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; তাদের চারপাশের বাজারব্যবস্থা, বিপণন, ক্রয়ক্ষমতা ও সহজলভ্য বিকল্পও সেই পছন্দ নির্ধারণ করে। বেশি আকর্ষণীয় স্বাদ, সহজপ্রাপ্যতা এবং হাতখরচের সামর্থ্য অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে শিশুদের টেনে নিতে পারে। অথচ স্বাস্থ্যকর বিকল্পের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত না করে শুধু সচেতনতার উপদেশ দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বর্তমানে স্কুলের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি তাই নীতিগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ও উদ্বেগ থাকার পরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে না কেন? নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ চিকিৎসার ব্যয় বাড়তে দেওয়ার চেয়ে অধিক দূরদর্শী পদক্ষেপ। নেদারল্যান্ডসের ১৪টি পৌরসভার জোট নতুন দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধিক নিয়ন্ত্রণ চেয়েছে। এ উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, স্কুলের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট আইন ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, খাদ্যের পুষ্টিমান, উপাদান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সহজবোধ্য তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয় ও আশপাশের দোকানে নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সাশ্রয়ী খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন, জবাবদিহি এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে।

শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা কোনো ঐচ্ছিক সামাজিক কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের মৌলিক শর্ত। যারা আগামী দিনে দেশ পরিচালনা করবে, অর্থনীতি এগিয়ে নেবে এবং সমাজের দায়িত্ব বহন করবে, তাদের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে উন্নয়নের দাবি টেকসই হতে পারে না। অতএব, অস্বাস্থ্যকর খাবারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার রোধে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের সামনে স্বাস্থ্যকর পছন্দ নিশ্চিত করা গেলে তবেই সচেতনতার আহ্বান বাস্তব অর্থ পাবে, আর সুশাসন ও উন্নয়ন পৌঁছাবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। 
সানা/আপ্র/১৭/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি
১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি

ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম বা অলসতার অজুহাতে চলন্ত গাড়ির সামনে...

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ
১৫ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ

ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শন ছিল দরিদ্র মানুষের হাতে পুঁজি তুলে দিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম...

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা
১৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে