‘আমার অক্ষররে একটু আমার কোলে দাওৃ আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও’ -ছেলের মরদেহ সামনে পেয়ে এভাবেই বুক চাপড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা শুক্লা রায়। কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় নিহত অক্ষর শৌভিক রায়ের মরদেহ সোমবার (৩ আগস্ট) খুলনার বাসভবনে পৌঁছালে সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
সকাল ১১টার দিকে খুলনা নগরের হাদিস পার্কসংলগ্ন মান্নান চটপটির গলির ছয়তলা বাড়ির সামনে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা অপেক্ষা করছিলেন লাশবাহী গাড়িটির জন্য। গাড়ি এসে থামার পর অক্ষরের নিথর দেহ নামানো হলে মুহূর্তেই অপেক্ষার নীরবতা পরিণত হয় কান্না আর আহাজারিতে।
স্বজনেরা জানান, ৩০ বছর বয়সী অক্ষর ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা শেখর রায় করোনাকালে মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়ে। মা, ছোট বোন, দাদা ও দিদিমাকে নিয়ে খুলনার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
অক্ষরের শিক্ষাজীবনও ছিল উজ্জ্বল। তিনি খুলনা জিলা স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। পরে ভারতের গুজরাট থেকে প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসেন। ঢাকার বনানীতে একটি শিক্ষা ও অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
স্বজন অপু সিংহ বলেন, অক্ষর খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ছিল অসাধারণ। তার চলে যাওয়ায় পুরো পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
গত শনিবার দুপুরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন অক্ষর। বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে নয়জনের একটি দল কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দুই হাজার টাকা দিয়ে প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট কাটেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্যারাসেইলিংয়ের সরঞ্জামে বেঁধে তাকে আকাশে ওড়ানো হয়। প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট ওপরে ওঠার পর হঠাৎ তিনি ছিটকে বঙ্গোপসাগরে পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, প্যারাসেইলিং পরিচালনায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। তাদের দাবি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম চলছিল। এ ঘটনায় প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।
অক্ষরের বড় বোন মেধা মৃত্তিকা রায় দুর্ঘটনার আগে তাকে প্যারাসেইলিংয়ে উঠতে নিষেধ করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা। কিন্তু আনন্দ ভ্রমণের সেই মুহূর্তই যে জীবনের শেষ সময় হয়ে যাবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, অক্ষরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি দেশের পর্যটন নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে। তাদের দাবি, ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন এমন শোকের মুখোমুখি না হয়, সে জন্য পর্যটন এলাকায় সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত অশ্রুসিক্ত স্বজনদের কাছ থেকে অক্ষরের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রূপসা মহাশ্মশানের উদ্দেশে। পেছনে পড়ে থাকে মায়ের আর্তনাদ আর প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩/৮/২০২৬