মামলার ভারে ক্রমেই ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরার বিচার বিভাগ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস শেষে জেলায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ হাজারে। বিপুলসংখ্যক এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রচলিত বিচারিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের দ্রুত, সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে বিচারপ্রাপ্তির পথ তৈরি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেছেন, শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়ে এই বিপুল মামলাজট নিরসন সম্ভব নয়। এর জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি বা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলো দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাসিক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বলেন, আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিদ্যমান বিচারিক কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত সময়ে সব মামলা নিষ্পত্তি করা কঠিন। তাই বিচার ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল, আধুনিক ও জনবান্ধব করতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, আপসযোগ্য মামলাগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিষ্পত্তি করা গেলে শুধু একটি মামলারই অবসান হয় না, বরং দীর্ঘদিনের বিরোধ, পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক দূরত্বও কমে আসে। এর মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আদালতের ওপর মামলার চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
তিনি আরো বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে সরকার জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করেছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগও সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে কয়েক ধরনের মামলা আদালতে দায়েরের আগে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আপসের উদ্যোগ নেওয়ার বিধান রয়েছে। এই কার্যক্রম সফল করতে বিচার বিভাগ, আইনজীবী, প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট বিএম মিজানুর রহমান পিন্টু। এ ছাড়া বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস, পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, জেলা তথ্য কর্মকর্তা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি শেখ আলমগীর আশরাফসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোস্তাফিজুর রহমান পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন সংশোধন-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো ও কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ নয়ন বিশ্বাস।
সভায় বক্তারা বলেন, মামলা জট কমানো, বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
তারা মনে করেন, বিচার বিভাগের পাশাপাশি আইনজীবী সমাজ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে দীর্ঘদিনের মামলা জট কমিয়ে মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের পথ আরো সহজ করতে।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬