তারেক মাহমুদ, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: একসময় লক্ষ্মীপুর শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত রহমতখালী খাল আজ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় প্রায় মৃত জলাধারে পরিণত হয়েছে। জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে স্থবির পানিতে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য এবং বাড়ছে জনদুর্ভোগ।
সদরের মজুচৌধুরীর হাট মেঘনা নদী থেকে চন্দ্রগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কয়েক দশক আগেও এই খালে সারা বছর নৌকা চলাচল করত। জোয়ারের পানিতে খাল ভরে উঠত এবং ভাটায় পানি স্বাভাবিকভাবে নেমে যেত। খালের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত এবং দুই পাড়ের কৃষকেরা সেচের জন্য এর ওপর নির্ভর করতেন।
বর্তমানে খালের অধিকাংশ অংশ ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন ও কচুরিপানায় ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও প্রভাবশালীরা খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এতে অনেক স্থানে খালের প্রস্থ সংকুচিত হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
শহরের বিভিন্ন অংশে খালের পানির রং কালচে হয়ে গেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে আশপাশের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, আগে এই খালে মাছ ধরা ও গোসল করা যেত, এখন খালের পাশে দাঁড়ানোই যায় না। দুর্গন্ধে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সরাসরি খালের সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা খালে পড়ছে। পাশাপাশি বাজার ও বসতবাড়ির বর্জ্যও প্রকাশ্যে ফেলা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করেছে।
খালের পাড়ের বাসিন্দা কুলসুমা বেগম জানান, খালের পঁচা পানির দুর্গন্ধে বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে এই পানি ঘরের কাজে ব্যবহার করা যেত, এখন তা সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে গেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলজ প্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় মাছ, ব্যাঙ, জলজ উদ্ভিদ ও পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে কৃষিকাজের জন্য পানির অনুপযোগিতায় কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বাঞ্চানগর এলাকার কয়েকজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, আগে খালের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া যেত, এখন সেই পানি ব্যবহার করলে জমি নষ্ট হয়ে যায়। পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা অত্যন্ত বেশি।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার শঙ্কাও বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত খাল খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রহমতখালী খাল সম্পূর্ণ অস্তিত্ব হারাবে।
টিআইবির সদস্য হাবিবুর রহমান সবুজসহ সচেতন মহল বলছেন, খাল রক্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত খনন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে ঐতিহ্যবাহী এই খাল আবারো প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ-জামান খান জানান, খালটি এখন খনন করা জরুরি। এ উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা সাইট পরিদর্শন করেছে। দখল ও দূষণ রোধে পৌরসভা ও জেলা পরিষদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে রহমতখালী খাল পরিদর্শন করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি জানান, রহমতখালী খাল পুনঃখননকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুত প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
সানা/ডিসি/১৯/৫/২০২৬