একসময় শীতের সন্ধ্যা নামলেই গ্রামবাংলার মাঠে বসত যাত্রাপালার আসর। গ্রামের খোলা প্রাঙ্গণে জড়ো হতেন নানা বয়সী মানুষ। রাতভর চলত গান, অভিনয় আর দর্শকের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিক বিনোদনমাধ্যমের বিস্তারে গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যটি ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নাচনী-ঘগোয়া গ্রামের অজিত বাবু ও স্থানীয় শিল্পীরা।
যাত্রাপালার পরিচালক অজিত বাবু জানান, প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রতি শীত মৌসুমে নিজ উদ্যোগে স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে যাত্রাপালার আয়োজন করেন তিনি। তাঁদের পরিবেশনায় প্রাণ ফিরে পায় গ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। যাত্রাপালাকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সামনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়।
একসময় গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল যাত্রাপালা। গান, সংলাপ ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এতে তুলে ধরা হতো সমাজের নানা ঘটনা, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং ন্যায়-অন্যায়ের কাহিনি। স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে এসব আয়োজন পরিণত হতো গ্রামবাসীর মিলনমেলায়। বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত যাত্রাপালা।
তবে আধুনিক বিনোদনমাধ্যমের প্রসার এবং নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় এ আয়োজন কমে গেছে। ফলে একসময়ের জনপ্রিয় এই লোকজ শিল্পের চর্চা ও প্রসারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় সুন্দরগঞ্জের নাচনী-ঘগোয়া গ্রামের অজিত বাবু ও তাঁর সহশিল্পীদের উদ্যোগ স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে যাত্রাপালার আয়োজন অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে তাঁরা গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের যুগেও গ্রামের মঞ্চে যাত্রাপালার গান ও অভিনয় মানুষকে শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই এই শিল্পের চর্চা ধরে রাখার উদ্যোগ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণেরও একটি প্রয়াস।
এসি/আপ্র/২৮/১০/২০২৬