বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে আগের নেওয়া ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের চাপ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণের অর্থছাড় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে নতুন ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অথচ আগের ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার, যা অর্থছাড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থছাড় কমেছে ৪৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, এ সময়ে ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার।
অর্থছাড় কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকায় অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, বড় প্রকল্প ও বাজেট সহায়তার ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধ শুরুর আগে নির্ধারিত অবকাশকাল শেষ হওয়ায় পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। পাশাপাশি নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের ধারাবাহিকতা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “আগেই টের পাওয়া গিয়েছিল, বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাবে। এখন সেটাই দেখা যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “মূলত বিগত সময়ে নেওয়া বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের বড় অঙ্কের ঋণ ও বাজেট সহায়তার গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, যা আগামী বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।”
নতুন সরকারের আট মাস পরও অর্থনীতির ধীরগতি না কাটায় বিদেশি ঋণকে খুবই প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তবে তাঁর মতে, এ মুহূর্তে প্রকল্পভিত্তিক ঋণের চেয়ে বাজেট সহায়তার ঋণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
জাহিদ হোসেন বলেন, “সরকারের এখন নগদ ডলার দরকার; সেজন্য বাজেট সহায়তার দিকে বেশি জোর দিতে হবে। কেননা, প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশি সহায়তা নিলে প্রকল্পের কেনাকাটার সময় ডলার আসে। এতে অনেক সময় চলে যায়। আর বাজেট-সহায়তার ডলার অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। তাই ডলারের জোগান বাড়াতে বাজেট-সহায়তাই উত্তম পন্থা।”
তিনি আরো বলেন, “বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখন সন্তোষজনক অবস্থায় আছে। কিন্তু আমদানি বাড়লে কিন্তু এই স্বস্তি আর থাকবে না। তাই কম সুদের বিদেশি ঋণের দিকে এখন সরকারকে জোর দিতে হবে।”
ছয় উন্নয়ন সহযোগীর ঋণ প্রতিশ্রুতি নেই: চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), ভারত, চীন ও রাশিয়া নতুন ঋণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ছয় উন্নয়ন সহযোগী ও দেশের কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না পাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না থাকার অর্থ হলো, এ তিন মাসে এসব উন্নয়ন সহযোগী ও দেশের অর্থায়নে নতুন কোনো প্রকল্পের ঋণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে নতুন প্রতিশ্রুতি না দিলেও এসব উৎস থেকে আগে অনুমোদিত ঋণের অর্থছাড় অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার ঋণের অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ কোটি ২১ লাখ ডলার দিয়েছে এডিবি। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার দিয়েছে ভারত।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা দিয়েছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। রাশিয়া দিয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ডলার এবং চীন দিয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। অন্যান্য দেশ ও সংস্থা মিলিয়ে অর্থছাড় হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। তবে এ তিন মাসে এআইআইবি কোনো ঋণের অর্থছাড় করেনি।
নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশ ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ডলারের নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৭ লাখ ডলার। সে হিসাবে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
তবে এ প্রতিশ্রুতির প্রায় পুরোটাই এসেছে অন্যান্য দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে। তাদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ১২৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। জাইকা ৩৫ লাখ ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, চীন, রাশিয়া ও ভারত এ সময়ে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
গত অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের রেকর্ড: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের সুদ-আসল বাবদ মোট ৪৪৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া এ পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করা হয়েছিল ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, গত অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ মোট ৮০৭ কোটি ডলার বা ৮০৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।
সামগ্রিকভাবে, বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়া, ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ বৃদ্ধি এবং বড় উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার প্রবণতা অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানো, স্বল্প সুদের ঋণ সংগ্রহ এবং বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
সানা/আপ্র/২৮/১০/২০২৬