মরক্কোতে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সংককালীন বৈঠকের পর ফিফার জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সভাপতি পদে বহাল থাকার জন্য ‘পূর্ণ সমর্থন’ দিয়েছে। ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার শেয়ার ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাবটি বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পরই এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে তার সভাপতিত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।
তবে বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, ৫৬ বছর বয়সী এই নেতা সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রোম এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ‘পূর্ণ সমর্থন’ লাভ করেছেন। নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ইনফান্তিনো লিখেছেন যে, সভায় উপস্থিত সবাই তার এবং গ্রাফস্ট্রোমের পদের প্রতি তাদের ‘সমর্থন বজায় রাখার’ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফিফা সভাপতি আরও যোগ করেছেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে ফিফা তার সততার ওপর কোনো আঘাত সহ্য করবে না এবং সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
উল্লেখ্য, সাধারণ সম্পাদক গ্রাফস্ট্রোম শুরুতে ইনফান্তিনোর এই গোপন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং চলতি সপ্তাহের শুরুতেই তিনি এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে গ্রাফস্ট্রোম বলেছিলেন, ‘ব্যক্তি, অস্থিতিশীল মুহূর্ত এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আসবে এবং যাবে,’ এবং পুরো ঘটনাপ্রবাহকে তিনি ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়ে দিনভর চলে।
এতে ফিফার পরিচালনা পর্ষদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গ্রাফস্ট্রোম ছাড়াও সদস্য দেশগুলোর প্রধান এলখান মাম্মাদোভ, প্রধান আইন কর্মকর্তা এমিলিও গার্সিয়া সিলভেরা এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা থমাস পেয়ারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ইনফান্তিনো এবং গ্রাফস্ট্রোমকে নারী আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে জাম্বিয়া ও মালাউইর ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হতে দেখা যায়। আল মদিনা স্টেডিয়ামে দুজনকে পাশাপাশি বসে হাসিমুখে কথা বলতে দেখা গেলেও, ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর সেখানে ছিলেন না। লামুর গত সপ্তাহে অভিযোগ করেছিলেন যে ইনফান্তিনো ফিফার কর্মীদের ‘প্রতারিত’ করেছেন।
ফিফা জানিয়েছে, বুধবারের বৈঠকে বিতর্কিত এফএফই প্রকল্পের বিষয়ে ‘ভুলগুলো স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে’। সংস্থাটি বলেছে, ‘এটি একমত হওয়া গেছে যে ফিফা কাউন্সিল এবং সদস্য দেশগুলোকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না, তবে পুরো বিষয়টি আরও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।’ সংবাদমাধ্যমে তথ্য ফাঁস হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতেও যে ত্রুটি ছিল, তাও বৈঠকে স্বীকার করা হয়েছে।
ফিফা কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য দেশের কাছে আলাদাভাবে এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ফিফা আরও জানিয়েছে যে, বর্তমানে একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা করা হবে এবং পরবর্তী সভায় ফিফা কাউন্সিলে এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করা হবে।
তবে অভ্যন্তরীণ সমর্থন পেলেও বাইরে থেকে ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। বুধবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইনফান্তিনো তার পরিকল্পনার মাধ্যমে সুশাসনে ‘মারাত্মক’ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কার্নি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইনফান্তিনোর ওপর তার আর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সাবেক ফিফা সভাপতি পদপ্রার্থী প্রিন্স আলী বিন আল হুসেইনও ফিফার বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর অভিযোগ তুলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা জর্ডানে নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা নিয়ে গর্ব করি। আমরা তাকে আগে সমর্থন করিনি এবং এখনো করব না। এই পরিস্থিতি আসলে ব্ল্যাকমেইল ছাড়া কিছুই নয়।’ ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছে। ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইনফান্তিনোর পুনর্র্নিবাচনের জন্য দেওয়া তাদের সমর্থনপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং কনকাকাফ সরাসরি পদত্যাগের ডাক না দিলেও ইনফান্তিনোর কাছে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের জরুরি জবাব চেয়েছে। আগামী মার্চ মাসে ফিফার পরবর্তী সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইনফান্তিনোর পদে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে তাদের হাতে প্রার্থী হওয়ার জন্য আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সময় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এই নির্বাচন ইনফান্তিনোর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
ডিসি/আপ্র/০৬/০৮/২০২৬