গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেনু

তারেক রহমান-------------------------

নির্বাসনের অন্ধকার ভেঙে ক্ষমতার আলোয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:২৯ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৩:০২ এএম ২০২৬
নির্বাসনের অন্ধকার ভেঙে ক্ষমতার আলোয়
ছবি

নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলন শেষে তোলা ছবিটি রয়টর্স থেকে সংগৃহীত

সতেরো বছরের নির্বাসন। অসংখ্য মামলা, সাজা, নিষেধাজ্ঞা। ভিডিও কলে পরিচালিত রাজনীতি। তারপর এক শীতের সকালে দেশে ফেরা-আর মাত্র ৪৭ দিনের ব্যবধানে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়। এই নাটকীয় উত্তরণে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এটি যেমন এক রাজনৈতিক পরিবারের তৃতীয় অধ্যায়, তেমনি সমকালীন বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলের এক গভীর প্রতীকী মুহূর্ত।

উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারভিত্তিক প্রত্যাশা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রহমান পরিবার একটি প্রভাবশালী অধ্যায়। ১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর বগুড়ার গাবতলীতে তারেক রহমানের জন্ম। তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক; পরে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। যাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাঁর মা খালেদা জিয়া-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, চার দশকের অধিক সময় দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু। এই উত্তরাধিকারের ভেতরেই বেড়ে ওঠা তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা কখনো ছিল আলোচিত, কখনো বিতর্কিত। কিন্তু এবার তিনি উত্তরাধিকার নয়, সরাসরি নির্বাচনি বিজয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে উঠেছেন-এটাই এই মুহূর্তের মৌলিক পার্থক্য।

দুঃসময়: গ্রেফতার, মামলা, নির্বাসন: ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেফতার হন তারেক রহমান। ১৩টি মামলা, যৌথ বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থতা-সব মিলিয়ে রাজনৈতিক জীবনের এক সংকটকাল। ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পেয়ে স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যাকে নিয়ে লন্ডনে যান। শুরু হয় দীর্ঘ নির্বাসন। এ সময়ের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে আরো বহু মামলা হয়; কয়েকটিতে সাজাও আসে, যার মধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডও ছিল। হাই কোর্ট তাঁর বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আদালতের দৃষ্টিতে তিনি ‘পলাতক আসামি’। কিন্তু রাজনীতিতে অনুপস্থিত ছিলেন না। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি। লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সেই পরিচালিত হয় দলীয় সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ‘দূরনিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব’ ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা।

প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। আদালতে একে একে মামলায় খালাস পান তারেক রহমান। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। লাখো কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতিতে রাজধানীতে সংবর্ধনা-রাজনীতির ভাষায় এটি ছিল এক শক্তিপ্রদর্শন, আর আবেগের ভাষায় এক প্রত্যাবর্তনের উল্লাস। 
কিন্তু আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন খালেদা জিয়া। শোক ও দায়িত্ব একসঙ্গে এসে পড়ে তার কাঁধে। ৯ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান ঘোষিত হন। মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে সরাসরি দলের কাণ্ডারী-এ যেন রাজনৈতিক পরিণতির এক অনিবার্য ধাপ।

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’, ভাষার রূপান্তর: দেশে ফিরে এক জনসভায় তিনি বলেন-‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’

এই উচ্চারণে ছিল আত্মবিশ্বাস, কিন্তু প্রতিশোধের আগুন নয়। বরং তিনি জোর দিয়েছেন শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের ওপর। তাঁর নির্বাচনি স্লোগান-‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সাদা শার্ট, জিন্স, কেডস, কখনো লাল ক্যাপ-রাজনীতির প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এক সরল উপস্থিতি। তিনি তরুণদের সঙ্গে সংলাপে বসেছেন, সংগঠনের তৃণমূল পুনর্গঠন করেছেন, এবং আওয়ামী লীগ-শূন্য নির্বাচনি মাঠে জামায়াতে ইসলামীর অতীত ও নীতির প্রসঙ্গ তুলে ‘ভাসমান ভোটার’দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত এই অবস্থান বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় এনে দেয়।

রাষ্ট্রনায়কের ভাষ্য: নির্বাচনে জয়লাভের পর তারেক রহমানের বক্তব্যে ফিরে এসেছে কয়েকটি পুনরাবৃত্ত শব্দ-শান্তি, শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন। তিনি বলেছেন, ‘দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ আমরা বরদাশত করব না।’ ‘আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে-সবার জন্য সমান।’
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্য ছিল- ‘প্রতিশোধ দিয়ে কী পাওয়া যায়? এখন দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’ এই ভাষ্য তাঁর আগের রাজনৈতিক পরিচিতির তুলনায় এক ধরনের রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে।

অতীতের ছায়া, ভবিষ্যতের পরীক্ষা: ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় ‘হাওয়া ভবন’ ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান-এসব স্মৃতি এখনো জনমানসে অম্লান। এবার তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘কোনো আপস নয়’, পদ্ধতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী পথই সবচেয়ে কঠিন। রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-সবকিছুকে সংস্কারের আওতায় আনতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।

একটি রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ: তারেক রহমানের এই উত্থান কেবল ব্যক্তি-নির্ভর রাজনৈতিক কাহিনী নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন পর্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতির পর তিনি যদি সত্যিই সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের পথ বেছে নিতে পারেন, তবে তা হবে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। অন্যথায়, ইতিহাস তাকে কেবল আরেকটি ক্ষমতার পালাবদলের অধ্যায় হিসেবেই স্মরণ করবে। 
নির্বাসনের নীরবতা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চারণ- এই যাত্রা এখনো অসমাপ্ত। বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে-
ঘোষিত ‘প্ল্যান’ কি রূপ নেবে কার্যকর নীতিতে? আইনের শাসন কি হবে সত্যিই সবার জন্য সমান? তারেক রহমানের সামনে এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের চ্যালেঞ্জ নয়-বরং রাষ্ট্রনির্মাণের দায়।

সংযমের রাজনীতি কি নতুন স্রোত আনবে? দেশে ফেরার পর তারেক রহমান-এর রাজনৈতিক ভাষ্যে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো তার সংযমী উচ্চারণ। দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতির ইতিহাসে যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি ও প্রতিশোধপরায়ণ বক্তব্য প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল, সেখানে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে অনুপস্থিত আক্রমণাত্মক শব্দচয়ন অনেকের নজর কেড়েছে। তিনি বিরোধীদের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেননি। তিনি অতীতের অন্যায়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন, কিন্তু প্রতিশোধের আহ্বান জানাননি। তিনি সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করেছেন, কিন্তু উসকে দেননি।

এই সংযম কেবল ব্যক্তিগত পরিণতির ইঙ্গিত নয়-এটি রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে। তবে কৌশল হোক বা রূপান্তর, তাঁর বক্তব্যে যে ধৈর্য ও সহনশীলতার ছাপ দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে এক ভিন্ন সুর যোগ করেছে।
নির্বাচনে জয়ের পর তাঁর আহ্বান- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বলের সুরক্ষা, প্রতিশোধ নয়-পুনর্গঠন-এসব উচ্চারণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে ‘শত্রু বনাম মিত্র’ দ্বন্দ্বচিত্র প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে যদি ক্ষমতাসীন দলের প্রধান নিজেই সহনশীল ভাষা বেছে নেন, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। কারণ ক্ষমতার ভাষাই শেষ পর্যন্ত জনপরিসরের ভাষাকে প্রভাবিত করে।
এ দেশে বহুবার দেখা গেছে-শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর ভাষ্য মাঠপর্যায়ে সহিংসতার রূপ নিয়েছে। তেমনি, শীর্ষ নেতৃত্বের সংযত উচ্চারণও মাঠপর্যায়ে শীতলতা আনতে পারে। তারেক রহমান যদি এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারেন-যদি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকেও সাংবিধানিক অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন, যদি প্রশাসন ও দলীয় কর্মীদের কাছে একই বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন- তবে বাংলাদেশের ‘অসুস্থ রাজনীতি’ ধীরে ধীরে সুস্থধারায় প্রবাহিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ইতিহাস বলছে, ব্যক্তিগত রূপান্তর কখনো কখনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরের সূচনা ঘটায়। নির্বাসনের দীর্ঘ নীরবতা হয়তো তাঁকে শিখিয়েছে-ক্ষমতার চেয়ে বড় হলো স্থিতি, প্রতিশোধের চেয়ে শক্তিশালী হলো পুনর্গঠন।
এখন দেখার বিষয়-এই সংযম কি কেবল নির্বাচনি সময়ের ভাষ্য, নাকি তা হয়ে উঠবে শাসনদর্শনের স্থায়ী ভিত্তি। যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল এক নেতার ক্ষমতায় ফেরা নয়-
বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষারও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

সানা/আপ্র/১৭/২/২০৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের অবসান- সাফল্য, বিতর্ক ও ইতিহাসের দায়
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের অবসান- সাফল্য, বিতর্ক ও ইতিহাসের দায়

নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর কাল

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, গ্যাস সংকট চরমে
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, গ্যাস সংকট চরমে

এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে...

বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনে সিক্ত তারেক রহমান
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনে সিক্ত তারেক রহমান

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ...

ভোট যেন উৎসব তাদের কাছে
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভোট যেন উৎসব তাদের কাছে

প্রত্যাশায় নতুন ভোর--------

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, এর মধ্যেই সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন?

মোট ভোট: ৩ | শেষ আপডেট: 2 সপ্তাহ আগে