দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটের দিনে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য-কোথাও সেলফির ভিড়, কোথাও প্রবীণের চোখে জল, কোথাও বরের সাজে তরুণের ভোটদান। গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানী থেকে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর থেকে নীলফামারী-ভোটকেন্দ্রগুলো ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ, আবার কোথাও ছিল প্রত্যাশা আর আক্ষেপের মিশ্র সুর। ভোটারদের কণ্ঠে বারবার ফিরে এসেছে একটাই কথা-নিজের ভোটটা নিজে দিতে পেরেছি।
শখের ভোট, তবু দায়িত্বের অনুভব: ঢাকা-৭ আসনের অনন্তময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুরে প্রথম ভোট দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিথী। তাঁর ভাষায়, প্রত্যাশা নাই, শখে ভোট দিতে আসছি। প্রতিনিধিদের কাছে দাবি না রাখার কথাও জানান তিনি। তবে একই কেন্দ্রে ভোট দেওয়া সুমা দাসের দাবি স্পষ্ট-এলাকার গ্যাস সমস্যার সমাধান চাই। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৪৩২ জন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৫৬১টি (১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ)। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এস এম এহতেশামুল আনাম জানান, পুরুষ ভোটার ১ হাজার ৭৯৭ ও নারী ১ হাজার ৬৩৫ জন। ঢাকা-৭ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭৭ জন। এখানে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রবাস থেকে ফেরা, জীবনের প্রথম ভোট: চট্টগ্রাম-৯ আসনে আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন কেন্দ্রে ৫৭ বছর বয়সে প্রথম ভোট দেন রবিউল হোসেন চৌধুরী। ২২ বছর বিদেশে ছিলেন। বললেন, একবারও ভোট দিতে পারিনি। এবার জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৩ জন; পুরুষ ২ লাখ ১৩ হাজার ৯০৬, নারী ২ লাখ ২ হাজার ৪৪৮ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৯ জন। এখানে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একই আসনের ভোটার জুরু জানান, ১৭ বছর পর নিজের ভোট দিতে পারছি। পরিবেশ ভালো।
তারুণ্যের ‘ঈদ ঈদ’ অনুভূতি: রাজধানীর খিলগাঁও, উত্তরা কিংবা পুরান ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রথমবার ভোট দেওয়া তরুণদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। নাফিসা আনজুম বলেন, কখনো ভাবিনি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারব। মাহমুদা মাহফুজের ভাষায়, খুব ঈদ ঈদ ফিল হচ্ছে। উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বন্ধুদের নিয়ে ভোট দিয়ে আড্ডায় মেতেছিলেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাইমিন ফুয়াদ। বলেন, এ রকম পরিবেশ জীবনে দেখিনি। অনেকেই ভোটের পর সেলফি তুলেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। নাগরিক দায়িত্ব যেন মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
পুরান ঢাকায় উৎসব, প্রবীণের চোখে তৃপ্তি: ওয়ারী, বংশাল, লালবাগ, চকবাজার-পুরান ঢাকার অলিগলিতে ছিল ভোট উৎসবের আবহ। আরমানিটোলা স্কুলে মোহাম্মদ মুসা বলেন, ১৭ বছর ভোট দিতে পারি নাই। আজ খুব খুশি লাগতাছে।
৬৫ বছরের শাহজাহান ক্রাচে ভর করে ভোট দেন। কামরাঙ্গীরচরে মনোয়ার হোসেন বলেন, লড়াই থাকলে ভোটের দাম থাকে। ঢাকা-৬ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ জন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোট শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়।
বরের সাজে ভোট, প্রতিবন্ধীর দৃঢ়তা: নীলফামারীর সৈয়দপুরে বিয়ের আগে বরের সাজে ভোট দেন সামিউল ইসলাম। তাঁর কথা, ‘আগে ভোট, পরে বিয়ে।’
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে শারীরিক প্রতিবন্ধী আমেনা বেগম শাজাহানপুর থেকে এসে ভোট দেন। বলেন, ‘১৭ বছর পর ভোট দিলাম। আল্লাহ যারে পাস করায়।’ অভাব ও শারীরিক কষ্টও তাঁকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
৫৬ বছর পর নারীদের ভোট: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে ৫৬ বছর পর নারীরা ভোটকেন্দ্রে আসেন। স্থানীয়ভাবে একসময় তাঁদের নিষেধ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতা বৃদ্ধির পর এবার নারীদের উপচে পড়া উপস্থিতি দেখা যায়। এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন; নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার ২৯৯। গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৪০১ ভোট পড়ে, যার মধ্যে ১৫৯ জন নারী। জেলা প্রশাসক নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের ভোট দেওয়া অপরাধ নয়।
প্রত্যাশার বহুমাত্রিক সুর: ঢাকা-৪ ও ৫ আসনে ভোটারদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশা। বৈশাখী আক্তার বলেন, যে দলই আসুক, জনগণের জন্য কাজ করুক।” নতুন ভোটার ইসরাত জাহান স্বপ্নার আশা, ‘দুর্নীতিমুক্ত সরকার চাই।’ অনেকে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বিষয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন। তবু তাঁরা অংশ নিয়েছেন। এক ভোটার বললেন, “ভোট দিতে আইছি, তাই ‘হ্যাঁ’ দিলাম।”
ফলাফলের অপেক্ষায় দেশ: কোথাও ধীরগতি, কোথাও দীর্ঘ লাইন; তবু সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন আসনে বিকেল পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ১৭ বছরের ব্যবধানে অনেকের কাছে এ ভোট ছিল অধিকার ফিরে পাওয়ার দিন। কেউ নতুন জামা পরে এসেছেন, কেউ ক্রাচে ভর দিয়ে, কেউ প্রবাস থেকে ছুটি নিয়ে, কেউ বরের সাজে। ভোট শুধু ব্যালটে সিল নয়-এ দিনটি হয়ে উঠেছে প্রত্যাশা, দায়িত্ব ও নাগরিক চেতনার এক সমবেত উৎসব। এখন সবার চোখ ফলাফলের দিকে-নতুন ভোরের আশায়।
সানা/আপ্র/১২/২/২০২৬