গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মেনু

নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর কাল

অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের অবসান- সাফল্য, বিতর্ক ও ইতিহাসের দায়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২১:৫৩ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০০:০৫ এএম ২০২৬
অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের অবসান- সাফল্য, বিতর্ক ও ইতিহাসের দায়
ছবি

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফাইল ছবি

দেড় বছরের অস্থির রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষে দেশ আবার একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা, প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থা এবং জনমনের বিভাজনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে গঠিত সেই সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল-রাষ্ট্রে স্থিতি ফেরানো এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন শেষে এবং নতুন সরকারের শপথের প্রাক্কালে সেই লক্ষ্যপূরণের প্রশ্নে একটি সংযত, তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন জরুরি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিলে তা দ্রুত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। এর ফলেই শেখ হাসিনা-র সরকারের পতন এবং দেশত্যাগ-রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতায় এক নাটকীয় মোড়। তিন দিনের ব্যবধানে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। শুরু থেকেই তাদের সামনে ছিল তিনটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখা এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কম সহিংস ছিল। বড় পরিসরে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার, সিসিটিভি মনিটরিং এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ-নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেনাপ্রধানের ঘোষণা-নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে-সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতার জন্য ইতিবাচক বার্তা। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ সেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরকে দৃশ্যমান করবে।

তবে কেবল নির্বাচনের সফল আয়োজনই একটি সরকারের পূর্ণ মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না। এই দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কথিত ‘মব জাস্টিস’-এর বিস্তার, ভিন্নমতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আরো একটি গভীর ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন সামনে এসেছে-২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার ওপর যে অভিঘাত এসেছে, তার দায় কে নেবে?

রাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৯৭১ কেবল একটি সাল নয়; এটি জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান-এসবই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার এবং কিছু সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ কিংবা স্বাধীনতার আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে-এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল এই স্পর্শকাতর জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং বিভাজনমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। সেখানে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধ সবসময় দেখা যায়নি-এই সমালোচনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।

গণতন্ত্র মানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা। ২০২৪-কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে তা হবে রাষ্ট্রচিন্তার গভীর সংকট। ইতিহাসের দায় এড়ানো যায় না; বরং রাষ্ট্রনায়কত্বের পরিচয় সেখানে-যেখানে সাময়িক রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিকে সংরক্ষণ করা হয়।

বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, জাতিকে সেবা করার সুযোগ পাওয়া তাদের সৌভাগ্য। এই স্বীকারোক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে দুটি বিষয়: এক, তারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন কি না; দুই, জাতীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষায় তারা কতটা সতর্ক ও দৃঢ় ছিলেন।

রাষ্ট্র আজ এক সন্ধিক্ষণে। গণঅভ্যুত্থান থেকে গণরায়-এই যাত্রাপথ ইতিহাসে স্থান পাবে। তবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নাম উজ্জ্বল হয় তখনই, যখন সাফল্যের সঙ্গে মূল্যবোধের সুরক্ষা যুক্ত থাকে। নতুন সরকারের জন্য এটাই বড় শিক্ষা-গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যেমন জরুরি, তেমনি অপরিহার্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার আদর্শের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা।
ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর যদি গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করে এবং একই সঙ্গে ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ভিত্তিকে অমলিন রাখে, তবেই এই দেড় বছরের অধ্যায়কে একটি প্রয়োজনীয় সেতুবন্ধন হিসেবে ইতিহাস স্বীকৃতি দেবে। অন্যথায়, বিতর্ক ও দায়-দুটিই সমানভাবে তার অনুসঙ্গ হয়ে থাকবে।

সানা/আপ্র/১৬/২/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, গ্যাস সংকট চরমে
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, গ্যাস সংকট চরমে

এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে...

বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনে সিক্ত তারেক রহমান
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনে সিক্ত তারেক রহমান

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ...

ভোট যেন উৎসব তাদের কাছে
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভোট যেন উৎসব তাদের কাছে

প্রত্যাশায় নতুন ভোর--------

জয়-পরাজয়ের সীমানা পেরিয়ে বাঁচুক গণতন্ত্রের আত্মা
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

জয়-পরাজয়ের সীমানা পেরিয়ে বাঁচুক গণতন্ত্রের আত্মা

বিশেষ মন্তব্য---------------------------------------------------------------

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, এর মধ্যেই সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন?

মোট ভোট: ৩ | শেষ আপডেট: 2 সপ্তাহ আগে