গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

দুর্গাপ্রতিমায় পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের প্রচলিত রীতি কেন

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৩০ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৪৫ এএম ২০২৬
দুর্গাপ্রতিমায় পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের প্রচলিত রীতি কেন
ছবি

ছবি সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আলোর সাজ আর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। প্রতি বছর দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাজুড়ে শুরু হয় উৎসব। তবে দেবীর প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রচলিত রীতি বহু মানুষের কৌতূহল জাগায়—দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে কেন যৌনপল্লির মাটি ব্যবহার করা হয়?

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির মাটিও ব্যবহার করা হয়। কোথাও এই মাটি প্রতিমা তৈরির মূল মাটির সঙ্গে মেশানো হয়, আবার কোথাও রীতিটির প্রতীকী গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

যে সমাজের একটি অংশ যৌনকর্মীদের অবহেলা ও বৈষম্যের চোখে দেখে, সেই সমাজের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসবের প্রতিমা তৈরিতে তাঁদের বসতির মাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনে রয়েছে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি বহুল আলোচিত ব্যাখ্যা। তবে এই রীতির উৎস ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রচলিত সব বক্তব্যের পক্ষে সমানভাবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই বিশ্বাস ও ইতিহাসের পাশাপাশি লোকাচারের পার্থক্য বোঝাও জরুরি।

কী এই ‘পুণ্যমাটি’?

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গার মূর্তি তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্র এবং যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের কথা বলা হয়। এসব উপাদানের সঙ্গে সাধারণ মাটি মিশিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয় বলে প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া নর্তকী, কাপালিনী, গোয়ালিনী, মালিনী, পতিতা, ধোপানি, নাপিতনি, ব্রাহ্মণী ও শূদ্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত মাটির উল্লেখও কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়।

বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের রীতি অনেক জায়গায় ‘পুণ্যমাটি’ বা ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ নামে পরিচিত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক ধরনের উপাদানের মধ্যে এই মাটিও একটি।

প্রচলিত রীতি অনুসারে, এই মাটি জোর করে নেওয়া বা টাকা দিয়ে কেনার বিষয় নয়। পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী মন্ত্র উচ্চারণ করে যৌনপল্লির বাসিন্দাদের কাছে মাটি চাইতে যান। তাঁরা স্বেচ্ছায় ও প্রসন্নচিত্তে মাটি দান করলে তা গ্রহণ করা হয় বলে লোকাচারে বর্ণিত রয়েছে।

তবে সব অঞ্চলে বা সব প্রতিমাশিল্পীর কাছে রীতিটি একইভাবে পালিত হয় না। কোথাও অল্প মাটি মূল মাটির সঙ্গে মেশানো হয়, আবার কোথাও প্রথাটি প্রতীকীভাবে স্মরণ করা হয়।

এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা। বলা হয়, পুরুষেরা যৌনপল্লিতে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে আসেন এবং পাপ নিয়ে ফিরে যান। সেই বিশ্বাস থেকেই যৌনপল্লির মাটিকে পুণ্যময় বলে মনে করা হয়। তবে এটি মূলত প্রচলিত লোককথা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার অংশ।

সমাজের চোখে ব্রাত্য, দেবীর কাছে কি তারাও সমান?

এই প্রথার সবচেয়ে আলোচিত ব্যাখ্যাটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে ঘিরে। সমাজের একটি অংশ যখন যৌনকর্মীদের অবজ্ঞা করে এবং তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে, তখন তাদের বসতির মাটি দুর্গাপ্রতিমায় ব্যবহারের রীতিকে অনেকে প্রতীকী তাৎপর্যে দেখেন। তাদের মতে, দেবীর আরাধনায় এই মাটির উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, সমাজ যাঁদের প্রান্তে ঠেলে রাখে, তাঁরাও সমাজেরই অংশ।

দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। সেই মাতৃভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে অনেকে বলেন, দেবীর কাছে সন্তানদের মধ্যে ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। এই ব্যাখ্যায় যৌনপল্লির মাটি গ্রহণ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক অবজ্ঞা ও বৈষম্য নিয়ে ভাবারও উপলক্ষ।

তবে মাটি ব্যবহারের রীতির অর্থ নিয়ে সবার ব্যাখ্যা এক নয়। তাই একে একমাত্র বা চূড়ান্ত ধর্মীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার বদলে লোকাচার, বিশ্বাস ও সামাজিক চিন্তার মিলিত প্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এই মাটি?

প্রচলিত বর্ণনায়, প্রতিমা তৈরির জন্য যৌনপল্লি থেকে মাটি সংগ্রহের একটি বিশেষ রীতির কথা বলা হয়। কোথাও পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পীর উদ্যোগে এই মাটি সংগ্রহ করা হয়। মাটি চাওয়া, তা গ্রহণ করা এবং প্রতিমা তৈরির উপকরণের সঙ্গে মেশানোর মধ্যে ধর্মীয় আচারের গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

লোকাচারে স্বেচ্ছায় মাটি দানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণিত হয়। অর্থাৎ, এই প্রথার প্রচলিত ব্যাখ্যায় মাটি সংগ্রহের পাশাপাশি দানকারীর সম্মতি ও সদিচ্ছার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পৌরাণিক কাহিনিতে কী বলা হয়েছে?

দেবীপুরাণের উল্লেখ করে প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে কেঁদে না ফেলার আশ্বাস দেন। দেবী বলেন, তার পূজায় ওই কিশোরীর আঙিনার মাটি প্রয়োজন হবে। এই কাহিনির ব্যাখ্যায় বলা হয়, সমাজ যাদের দূরে ঠেলে দেয়, মহামায়া তাঁদেরও মমতায় আপন করে নেন।

আরেকটি পৌরাণিক ও জনপ্রিয় কাহিনি অনুসারে, একবার কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছিলেন। পথে তাদের চোখে পড়ে গঙ্গার তীরে বসে থাকা এক কুষ্ঠরোগী। তিনি অন্যদের কাছে অনুরোধ করছিলেন, যেন তাকে গঙ্গায় স্নান করতে সাহায্য করা হয়। কিন্তু কেউ তার দিকে এগিয়ে আসছিলেন না। তখন ওই নারীরা তাঁর প্রতি করুণা দেখিয়ে তাকে গঙ্গাস্নানে সাহায্য করেন।

কাহিনি অনুযায়ী, সেই কুষ্ঠরোগী আর কেউ নন, স্বয়ং শিব। নারীদের আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেন এবং তাদের বর চাইতে বলেন। তখন তারা বর চান, তাদের উঠোনের মাটি দিয়ে যেন দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়। শিব তাদের সেই বর দেন। এরপর গঙ্গার তীরের মাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির আঙিনার মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির প্রথা শুরু হয় বলে এই লোককথায় বর্ণিত রয়েছে।

এই কাহিনিগুলো মূলত প্রচলিত পৌরাণিক বিশ্বাস ও লোককথার অংশ। এগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সম্পর্কে সব ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে সামাজিকভাবে অবহেলিত মানুষের মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গে রীতিটি নিয়ে আলোচনা হয়।

সূত্র: নিউজ এইটটিন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

এসি/আপ্র/১০/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

হজ এজেন্সিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জরুরি নির্দেশনা
১০ অক্টোবর ২০২৬

হজ এজেন্সিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জরুরি নির্দেশনা

আগামী বছরের হজে অংশগ্রহণকারী অনুমোদিত হজ এজেন্সিগুলোর অনুকূলে ‘হজ মিশন ভিসা’ ইস্যুর লক্ষ্যে রবিবার (...

শুভ মহালয়া শনিবার, শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা
০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুভ মহালয়া শনিবার, শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা

বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে শনিবার (১০...

আল্লাহর সাহায্য পেতে ধৈর্য ও নামাজের শিক্ষা
০৮ অক্টোবর ২০২৬

আল্লাহর সাহায্য পেতে ধৈর্য ও নামাজের শিক্ষা

আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ সবার প্রয়োজন হয়। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বিপদ থেকে উদ্ধার বা সুখের মুহূর্ত স্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

অটোরিকশার দাবির পক্ষে বলা নেতার আছে ৭০০ বাহন

অটোরিকশা চালকদের দাবি মেনে নেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ৭০০টি অটোরিকশা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেছেন, জনগণের কাছে বারবার খোলস বদলে পার পাওয়া যাবে না। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের পিলারে জুলাইয়ের চিত্রাঙ্কন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাত শ অটোরিকশা থাকার অভিযোগকে কাল্পনিক, অসত্য ও ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চেয়েছে দলটি| প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন প্রশাসক সত্য বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 16 ঘন্টা আগে