জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে বাংলাদেশের নতুন যাত্রার কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “আমরা পথ হারিয়ে ফেললে এখানে এসে পথ খুঁজে নেব। আমাদের চিন্তায় কোনো গাফিলতি এলে এখান থেকে তার ঠিকানা বের করব। নতুন সূত্রে আবার যাত্রা শুরু করব।”
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শেখ হাসিনার সাবেক বাসভবনে নির্মিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এ জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকালে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনেরা।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “সাধারণত জাদুঘর অতীতের ইতিহাস সংরক্ষণ করে। কিন্তু এই জাদুঘরটি ভিন্ন। এখানে একেবারে টাটকা, নতুন যে ঘটনা ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিটি নমুনা, প্রতিটি ইতিহাস আমরা সংগ্রহ করে এই স্মৃতি জাদুঘরে নিয়ে এসেছি। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি নতুন পর্যায় সৃষ্টি করেছে। অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই জাদুঘর অতীতকে ধারণ করেছে, আবার ভবিষ্যতের পথও তৈরি করছে।”
তরুণদের জন্য ইতিহাসের কেন্দ্র হবে
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের যত তরুণ-তরুণী এবং নাগরিক আছেন, সবার যেন একবার এখানে আসার সুযোগ হয়। তারা দেখবে, নিজের মনের কথা লিখে রাখবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের চিন্তা ও স্বপ্ন এখানে লিপিবদ্ধ করে যাবে।”
তিনি বলেন, “এই চত্বর মানুষের পদচারণায় মুখর হবে। এখানে যে স্মৃতিগুলো সংরক্ষিত হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে মানুষ জানবে কে কোথায় কীভাবে আত্মত্যাগ করেছেন, সেই ইতিহাসও এখানে থাকবে।”
‘সাধারণ মানুষের আন্দোলন ছিল জুলাই’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষদের সাধারণ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “তারা আমাদেরই বন্ধু-বান্ধব, আমাদেরই ছেলে-মেয়ে, আমাদেরই প্রতিবেশী। তারা কোনো বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক কর্মী ছিল না।”
তিনি বলেন, “তারা চেয়েছিল—এই বাংলাদেশ আর এভাবে চলবে না, আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ব। এটাই ছিল তাদের আশা।”
শহীদ আনাসের একটি চিঠির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমরা গেলাম, আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চলে গেলাম—এটাই এই জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য।”
ইতিহাসের ‘নাড়ির সূত্র’ ধরে এগোনোর আহ্বান
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এখান থেকে আমাদের নাড়ির সূত্র যেন আর ছিন্ন না হয়। বাংলাদেশ নতুন ভঙ্গিতে, নতুন দৃষ্টিতে সামনে এগিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “আত্মমর্যাদা ও সাহস নিয়ে আমরা আমাদের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।”
জাদুঘর নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি উপকরণ সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময়, শ্রম ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়েছে।
জাদুঘরে থাকবে আন্দোলনের স্মৃতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা, শহীদদের স্মৃতি, আন্দোলনের প্রতীকী উপকরণ এবং সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের আঁতুড়ঘর। এখান থেকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তার পথ খুঁজে নেবে।”
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতি, তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা।
এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য, আহত যোদ্ধা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৫/৮/২০২৬