জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সরকার বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে এই ভাড়া কীভাবে নির্ধারণ ও আদায় হবে-তা নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে সম্ভাব্য বিরোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরইমধ্যে অনেক বাসে এ নিয়ে বাক-বিতণ্ডার চিত্র দেখাও যাচ্ছে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, এখনো অধিকাংশ লোকাল বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। বাড্ডা, পল্টন, কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসগুলোতে যাত্রীরা পুরনো ভাড়ায় চলাচল করছেন। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন ভাড়ার তালিকা এখনো হাতে না পাওয়ায় পুরনো হারই কার্যকর রয়েছে।
উত্তরা-পল্টন, সদরঘাট-আব্দুল্লাহপুর ও কদমতলী-টঙ্গী রুটে চলাচলকারী বাসের কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজাররা জানান, মালিকপক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে নতুন ভাড়ার চার্ট প্রস্তুত হচ্ছে এবং যেকোনো সময় তা কার্যকর হতে পারে।
বাস শ্রমিকদের দাবি, কিলোমিটারভিত্তিক ১১ পয়সা বৃদ্ধি বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন, বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে। এতে ভাড়া নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হবে এবং যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একাধিক কন্ডাক্টর বলেন, “কম দূরত্বে কয় পয়সা বাড়াবো-এটা হিসাব করাই কঠিন। এতে প্রতিদিনই ঝামেলা হতে পারে।”
অন্যদিকে যাত্রীদের মধ্যে বিরাজ করছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। তাদের আশঙ্কা, সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বাস্তবে বেশি ভাড়া আদায় করা হতে পারে। কারণ, অতীতে ভাড়া বাড়ানোর পর তদারকির অভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ছিল।
কুড়িল বিশ্বরোড থেকে গুলিস্তানগামী এক যাত্রী বলেন, “আজ আগের ভাড়াই দিলোাম, কিন্তু আগামীতে কত বাড়বে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। সরকার ১১ পয়সা বললেও বাস্তবে কত নেয় সেটাই দেখার বিষয়।” পল্টন-রামপুরা রুটের আরেক যাত্রী জানান, তিনি এখনো আগের ভাড়া দিলেও খুব শিগগিরই বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে বলে মনে করছেন।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু কিছু রুটে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সরকার কিলোমিটারপ্রতি মাত্র ১১ পয়সা বাড়িয়েছে, বাস্তবে তা নির্দিষ্ট দূরত্বে সমন্বয় করতে গিয়ে একবারে কয়েক টাকা বাড়ানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যাত্রীদের একাংশ বলছেন, “কিলোমিটারে পয়সা বাড়িয়ে লাভ নেই, শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছ থেকে একসঙ্গে বেশি টাকা নেওয়া হবে।” তাদের মতে, কার্যকর তদারকি না থাকলে এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
পরিবহন শ্রমিকরা আবার বলছেন, তারা সরকার নির্ধারিত হারেই ভাড়া নিতে চান। তবে ভাড়ার তালিকা না থাকলে এবং নির্দিষ্ট নির্দেশনা না পেলে বাস্তবে তা মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে যাত্রীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীসহ আন্তঃজেলা বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর আগে ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করে।
সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে যাত্রীদের মনে প্রশ্ন-কম দূরত্বে কয়েক পয়সার হিসাব কীভাবে মিটবে, আর সেই হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই কি বাসে বাসে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হবে?
সানা/আপ্র/২৫/৪/২০২৬