দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ভোট উৎসবের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন।
মোট ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবার গ্রহণ করা হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কেন্দ্রভিত্তিক ঝুঁকি, নজরদারিতে প্রযুক্তি: ইসি জানায়, সারা দেশে ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সশরীরে ভোট গ্রহণ হবে এবং ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে। ইন-পার্সন ভোটিং কেন্দ্রের প্রায় অর্ধেককে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘এত বিশাল পরিসরে ফোর্স ও প্রযুক্তি ডেপ্লয় বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি।’
৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে: নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকছেন ৯ লাখ ৫৮ হাজার পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করবেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। এরই মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র। ইসি জানিয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টির বেশি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের বিশাল উপস্থিতি: এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক ও ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। সংবাদ সংগ্রহে নিবন্ধন করেছেন ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক, যার মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি।
ব্যালট পৌঁছেছে সব আসনে: ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ২৯৯টি আসনে ব্যালট পেপার পৌঁছে গেছে। সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের কার্যালয় থেকে ভোটের সামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। পোস্টাল ভোটের জন্য ৭ লাখের বেশি ব্যালট ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছেছে। ভোটের দিন প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর চার দফায় অগ্রগতির তথ্য জানাবে ইসি। অধিকাংশ ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইইউ পর্যবেক্ষকদের আশাবাদ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন, এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।’
তিনি জানান, কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। নারী ও সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাকে নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য অত্যন্ত জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে আশাবাদ: নির্বাচন কমিশন ভোটার উপস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। ঢাকাসহ বড় শহর থেকে মানুষের গ্রামে ফেরার ঢলকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে ইসি। কমিশনের পক্ষ থেকে সব রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের প্রতি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভোটের দিন পাঁচ ধরনের যানবাহন চলাচল নিষেধ: গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ উপলক্ষে আগামীকাল বুধবার মধ্যরাত ১২টা থেকে ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল সারা দেশে বন্ধ থাকবে। ভোট গ্রহণের দিন (বৃহস্পতিবার) মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মধ্যরাত ১২টা থেকে ভোট গ্রহণের পরদিন শুক্রবার মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে ইসির স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেল চলাচলে বাধা নেই।
ইসি জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ও অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকবে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন (ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি এবং সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন) চলবে। আত্মীয়স্বজনের জন্য বিমানবন্দরে যাওয়া, বিমানবন্দর থেকে যাত্রী বা আত্মীয়স্বজনসহ নিজ বাসস্থানে অথবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত যানবাহন (টিকিট বা অনুরূপ প্রমাণ প্রদর্শন) চলতে পারবে।
ইসি আরো জানিয়েছে, দূরপাল্লার যাত্রী বহনকারী অথবা দূরপাল্লার যাত্রী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য যেকোনো যানবাহন চলতে পারবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য একটি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও নির্বাচনী এজেন্টের (যথাযথ নিয়োগপত্র/পরিচয়পত্র থাকা সাপেক্ষে) জন্য একটি গাড়ি (জিপ, কার, মাইক্রোবাস ইত্যাদি ছোট আকৃতির যানবাহন) রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমোদন ও গাড়িতে স্টিকার প্রদর্শন সাপেক্ষে চলাচল করতে পারবে। সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক অথবা জরুরি কোনো কাজে ব্যবহৃত যানবাহন ও মোটরসাইকেল নির্বাচন কমিশন/রিটার্নিং অফিসারের অনুমোদন সাপেক্ষে চলাচল করতে পারবে বলেও উল্লেখ করেছে ইসি। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারবে।
সানা/আপ্র/১০/২/২০২৬