গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

মেনু

জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা

নির্বাচনের ফল যাই হোক, জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিন

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৫৯ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৫:৩৩ এএম ২০২৬
নির্বাচনের ফল যাই হোক, জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিন
ছবি

জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস -ছবি সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং ভোটারদের প্রতি গণতন্ত্রের প্রকৃত আদর্শ সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।

ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, পরাজয়ও এর অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না, এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে- এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না। তিনি বলেন, আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ-নির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর আজ আবার গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আপামর জনগণের-বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের-আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী। প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যার তাৎপর্য থাকে সুদূরপ্রসারী, যেদিন নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র এবং স্থায়িত্ব ও আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। আগামী পরশু ঠিক তেমনই একটি দিন, যেদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব।
ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাগ করে নেওয়াকে আমি আমার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করেছি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন। এই পরিবেশ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। এজন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই দেশের সব রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যকে। আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি আশাব্যঞ্জক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছি।

‘তবে এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও আমাদের হৃদয়ে গভীর বেদনার ছায়া রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় আমরা কিছু মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছি। এই সহিংসতা জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া- কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।’
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এবারের নির্বাচনে ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা এ যাবৎকালের যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। আগের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে এর চেয়ে বেশি প্রার্থী প্রায় কখনোই দেখা যায়নি।

এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারব, নাকি আবারো পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাব- এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট। আমি সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিন। বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই আমাদের তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের সঙ্গে। আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল কিন্তু ভোট ছিল না; ব্যালট ছিল কিন্তু ভোটার ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের সবচেয়ে বড় মূল্য জাতিকে প্রতিদিন দিতে হয়েছে। তবু আপনারা আশা ছাড়েননি। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। আন্দোলনে, প্রতিবাদে, চিন্তায় ও স্বপ্নে আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। আজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিনটি এসেছে। বিশেষ করে আমাদের নারীরা-মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবকটি গণআন্দোলন, পরিবার থেকে রাষ্ট্র-সবখানেই শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আরো বলেন, নারীরাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। নারীরাই এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্ত ভিত। ক্ষুদ্রঋণ, কুটির শিল্প, নারী উদ্যোক্তা- এই শব্দগুলোর পেছনে আছে পরিবর্তনের গল্প, পরিবার ও সমাজে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প। আপনারা ঘরে, রাজপথে সমানভাবে সংগ্রাম করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন, সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন, অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন। এই নির্বাচন আপনাদের জন্য এক নতুন সূচনা। আর আমাদের তরুণরা- যাদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ।
সানা/আপ্র/১০/২/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইসিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মনোনয়নপত্র জমা তিনটি
১৩ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইসিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মনোনয়নপত্র জমা তিনটি

আসন্ন ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প...

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যানি, এলজিআরডিতে সালাহউদ্দিন
১৩ আগস্ট ২০২৬

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যানি, এলজিআরডিতে সালাহউদ্দিন

আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআর...

আমরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলকে নির্বাচিত করতে চাই: চিফ হুইপ
১৩ আগস্ট ২০২৬

আমরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলকে নির্বাচিত করতে চাই: চিফ হুইপ

আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব মি...

জ্বালানি সংকটে নতুন তিন এলএনজি টার্মিনাল
১৩ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি সংকটে নতুন তিন এলএনজি টার্মিনাল

জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন আরো তিনটি ভ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই