বাংলাদেশে বেড়াতে এসে প্রতারণার শিকার হয়ে ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারিয়েছিলেন জার্মান পর্যটক কিরিল ল্যান্ডার ওয়েবার। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) নাটোর রেলস্টেশনে এসব জিনিস হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ। নাটোর সদর থানায় তাঁর কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি হয়। সেই ভিডিও দেখে এগিয়ে এসেছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মুক্তি মাহমুদ। তিনি কিরিলকে একটি ম্যাকবুক উপহার দিয়েছেন।
কিরিলের কান্নার ভিডিও দেখে মুক্তি মাহমুদের নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। সেই আবেগ থেকেই জার্মান তরুণের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শনিবার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে কিরিলের হাতে ম্যাকবুকটি তুলে দেন মুক্তি মাহমুদ। বাংলাদেশ থেকে ফেরার আগে তরুণ এই পর্যটক যেন অন্তত কিছু ভালো স্মৃতি নিয়ে যেতে পারেন, সেটিই তার প্রত্যাশা।
মুক্তি মাহমুদ বলেন, কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিরিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরা চুরি যাওয়ার খবর দেখছিলেন তিনি। একপর্যায়ে থানায় বসে কিরিলের কান্নার ভিডিও দেখে মর্মাহত হন।
আনজুমান ডিজাইনার্স লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মুক্তি মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে এসে ১৮ বছর বয়সী এক বিদেশি পর্যটকের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়াটা দেশের জন্য লজ্জার। বিষয়টি তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। কিরিলের বয়সী তারও একটি ছেলে রয়েছে, যে বিদেশে পড়াশোনা করে। ছেলের কথা মনে হওয়ায় ঘটনাটি তাকে আ বেশি নাড়া দেয়।
ভিডিওটি দেখার পর থেকেই কিরিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন মুক্তি মাহমুদ। পরে শাওন নামে একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
মুক্তি মাহমুদ বলেন, ‘সবার পক্ষ থেকে একটি ম্যাকবুক উপহার দিয়েছি। বাংলাদেশ ছাড়ার আগে ছেলেটা একটু হলেও যেন ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারে।’
রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় বসবাস করেন মুক্তি মাহমুদ। দীর্ঘ সময় লন্ডনে ছিলেন তিনি। বর্তমানে আনজুমান ডিজাইনার্স লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। কিরিলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে—এমন ভাবনা থেকেই তার পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
নতুন ম্যাকবুক পেয়ে কৃতজ্ঞ কিরিল
এদিকে তিন দিন পার হলেও কিরিলের হারানো ল্যাপটপ ও ক্যামেরা উদ্ধার হয়নি। তবে নতুন ম্যাকবুক পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন জার্মান তরুণ।
তিনি বলেন, জিনিসপত্র হারানোর পর থেকে অনেকেই তাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন এবং সহানুভূতি জানিয়েছেন। বিষয়টি তাঁর কাছে প্রশংসনীয়। নতুন ম্যাকবুক পেয়ে তিনি ধন্যবাদ জানান। এটি ব্যবহার করে আবার কাজ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি। এ ঘটনাকে জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে দেখছেন কিরিল।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, কিরিল পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজের ল্যাপটপটি কিনেছিলেন। সেটি চুরি হয়ে যাওয়া দুঃখজনক ও দেশের জন্য লজ্জাজনক। পুলিশ চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে তাকে ম্যাকবুক উপহার দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও দেশের সম্মান ফিরবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চলছে তদন্ত
জার্মান তরুণের চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, ঘটনাটি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং চুরি যাওয়া মালামাল কোথায় রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য সূত্র ধরে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে এসে জার্মান নাগরিক কিরিল ল্যান্ডার ওয়েবার বগুড়া থেকে একটি লোকাল ট্রেনে সান্তাহারে আসেন। পরে সান্তাহার থেকে বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস ট্রেনে নাটোর রেলস্টেশনে পৌঁছান।
নাটোর থেকে আরেকটি ট্রেনে করে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত হয়ে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। এ জন্য নাটোর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের অপেক্ষাকক্ষে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ওই সময় সুযোগ বুঝে এক প্রতারক তার ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে কৌশলে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বুধবার রাতে নাটোর সদর থানায় অভিযোগ করেন কিরিল।
রেলওয়ে পুলিশের সান্তাহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল উদ্দিন বলেন, নাটোর ও সান্তাহার প্ল্যাটফর্মের সিসিটিভি ফুটেজে ভেস্ট পরা ব্যক্তিকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তিনি রেলওয়ের কেউ নন। প্রাথমিক ধারণা, ওই ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হতে পারেন।
ওসি আরো বলেন, প্রথম দিন ল্যাপটপটির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও এখন আর তা জানা যাচ্ছে না। হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ উদ্ধারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এসি/আপ্র/১১/১০/২০২৬