জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করতে নতুন দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আগের উদ্যোগ বাতিল করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নেওয়া এই পদক্ষেপ নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প আদেশ দুটিতে স্বাক্ষর করেন। এগুলোর মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ বা সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশিদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ সীমিত করা এবং তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তানের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ বন্ধ করা।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট একটি ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং সেই সিদ্ধান্ত সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার বলেন, নতুন আদেশ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বার্থ ট্যুরিজমের চর্চা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে একটি ব্যাপক নির্বাহী আদেশ জারি করেছিল। তবে গত ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে অসাংবিধানিক হিসেবে বাতিল করে দেয়। আদালত তখন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর আলোকে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের অধিকার বহাল রাখে।
সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ের পর ট্রাম্প কংগ্রেসকে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু আইন পাসের পথে না গিয়ে এবার তিনি আবারও নির্বাহী আদেশের পথ বেছে নিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন আদেশ আগের বাতিল হওয়া নির্দেশনার পুনরাবৃত্তি নয়। এতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যতিক্রমী বিধানের ব্যাখ্যা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
নতুন আদেশে যেসব শিশুকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে, তাদের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করা কিছু ব্যক্তি, ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের’ সদস্য হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের সন্তান এবং যেসব বাবা-মা নাগরিকত্ব লাভের উদ্দেশ্যে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে প্রমাণিত হবেন, তাদের সন্তান।
এ ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সন্তানদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যতিক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন অঞ্চল বা জলসীমায় জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্ব না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ফেডারেল আইনে স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্বের বিধান নেই। বর্তমানে আমেরিকান সামোয়া এ ধরনের অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।
দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশে বার্থ ট্যুরিজম ঠেকাতে ফেডারেল সংস্থাগুলোকে এ ধরনের ভ্রমণের আয়োজনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, লাখ লাখ মানুষ এই পদ্ধতির মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভের চেষ্টা করেছে এবং এটিকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের আদমশুমারিভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা আনুমানিক ২২ হাজার থেকে ২৬ হাজার। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিদেশি ঠিকানা ব্যবহার করে শিশু জন্ম দেওয়ার ঘটনা ছিল প্রায় ৯ হাজার ৬০০টি, যা মোট জন্মের ১ শতাংশেরও কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা ইতোমধ্যেই ভিসা জালিয়াতি হিসেবে অবৈধ। ফলে নতুন আদেশ বাস্তবে বিদ্যমান আইনের বাইরে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী সরাসরি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করায় ট্রাম্পের নতুন আদেশও দ্রুত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ফলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আবারও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান
সানা/আপ্র/৭/৮/২০২৬