সিন্ধু চুক্তির (আইডব্লিউটি) অধীনে পাকিস্তানের পানির ন্যায্য হিস্যা কেড়ে নেওয়ার যে কোনো ভারতীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক বলেছেন, সিন্ধুর পানি আটকালে হাত কেটে ফেলা হবে।
মালিকের এই বক্তব্যটি পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এর ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করা হয়েছে। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে।
২০২৫ সালে পাহলগামে এক সন্ত্রাসী হামলায় ২৫ জন পর্যটক ও একজন স্থানীয় নাগরিকসহ মোট ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে কয়েক দশকের পুরোনো এই ঐতিহাসিক পানি চুক্তিটি স্থগিত রাখার যে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। মূলত এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই কঠোর এই মন্তব্য করেছেন মুসাদ্দিক মালিক।
সোমবার (২৯ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পানির অংশ ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার অভিযোগ তোলেন ও জোর দিয়ে বলেন যে, পাকিস্তান কাউকে তাদের পানির ন্যায্য অধিকার বাধাগ্রস্ত করতে দেবে না।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মালিক বলেন, প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে একটি পানির কল (ট্যাপ) রয়েছে। তিনি বলছেন যে তিনি পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও প্রবাহিত হতে দেবেন না।
পাকিস্তানের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্য কেউ একটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, ৫০ শতাংশ কর্মসংস্থান এবং ২৫ শতাংশ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
মুসাদ্দিক মালিক আরো দাবি করেন, পাকিস্তান এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে যে কেউ তাদের পানি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করলে তাকে মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি বলেন, তবে এখানে ন্যায়েরও তো প্রশ্ন রয়েছে। আমরা নিজেদের রক্ষা করবো... এটি কেবল-ই আমাদের ঘোষণা নয়, আমরা অতীতেও প্রমাণ করেছি যে কেউ যদি আমাদের পানির অংশে হাত দেয়, তবে আমরা সেই হাত কেটে ফেলবো।
তিনি বিশ্বরাজনীতির উদাহরণ টেনে বলেন, পৃথিবীর অন্য প্রান্তগুলোতে কোনো চুক্তি না থাকলেও কেবল আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ওপর ভিত্তি করেই অববাহিকার উচ্চ দেশ থেকে নিম্ন দেশে পানি প্রবাহিত হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, উচ্চ অববাহিকার প্রতিটি দেশের কি এখন নিম্ন অববাহিকার দেশের পানি প্রবাহ বন্ধ করার অধিকার আছে? আমাদের তো একটি বৈধ চুক্তিও রয়েছে। তাহলে এখানে কীভাবে পানি বন্ধ করা যেতে পারে? এই বিষয়টির পক্ষে আমরা আগামীকাল আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তি উপস্থাপন করবো।
একই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারও জোর দিয়ে বলেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তিটি এখনো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ও কোনো পক্ষ একতরফাভাবে এটি স্থগিত, বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। তিনি দাবি করেন, এই ‘আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য চুক্তির’ অধীনে সিন্ধু নদের পানিসম্পদের ওপর পাকিস্তানের জনগণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী তথ্যমন্ত্রী বলেন, আইনিভাবে পাকিস্তানের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন লাভ করেছে, কারণ সিন্ধু চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল, বিলুপ্ত বা সংশোধন করা অসম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার স্পষ্ট করে বলেছেন যে, পানি আমাদের জীবনরেখা ও একই সঙ্গে এটি আমাদের জন্য একটি রেড লাইন।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই তীব্র প্রতিক্রিয়াটি এমন এক সময়ে এলো, যার কিছুদিন আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পানিসম্পদ মন্ত্রী সি আর পাতিল এনডিটিভি-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ভারত আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সিন্ধু নদের পানিতে তাদের পুরো অংশটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে চায় ও ভারতের জন্য বরাদ্দ এক ফোঁটা পানিও পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।
গত বছর ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর নয়াদিল্লি একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তিটি স্থগিত করে রেখেছিল। ভারতের দাবি, ইসলামাবাদ যতক্ষণ না তাদের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অবকাঠামো ভেঙে ফেলার দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখাবে, ততক্ষণ এই পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদ ও এর উপনদীগুলোর পানি বণ্টন ও ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
সূত্র: এনডিটিভি, ডন
এসি/আপ্র/৩০/৬/২০২৬