যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষ এ ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টির পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও ভোট দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে হাতবদলের ঘটনা এর আগে মাত্র তিনবার ঘটেছিল-১৯৪৬, ১৯৯৪ ও ২০০৬ সালে। ২০২৬ সালে আবারো সেই নজির তৈরি হলো।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে দুই ডজনের বেশি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আসন ডেমোক্র্যাটরা পুনরুদ্ধার করেছেন। সেনেটেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। টেক্সাস, আইওয়া, কানসাস, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা ও সাউথ ক্যারোলাইনায় জয় দলটির সাফল্যকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। বিশেষ করে টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকান-প্রধান এলাকায় জয়কে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটারদের অসন্তোষের কেন্দ্রে ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি ও অভিবাসন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান। ডেমোক্র্যাটরা প্রচারে এসব বিষয়কে সামনে এনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্টের নীতিকে দায়ী করেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করলেও ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ছিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাঁর দলের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মানতে রাজি হননি তিনি। ফক্স নিউজ ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডেমোক্র্যাটদের বিজয় মেনে নেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে তাঁদের প্রস্তাবিত কোনো ‘উন্মাদ’ বিল অনুমোদন না করার হুমকিও দিয়েছেন।
নির্বাচনের পরিসংখ্যানেও ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক ভোটার বলেছেন, তাঁরা প্রেসিডেন্টের প্রতি অনাস্থা জানাতেই ভোট দিয়েছেন। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চান, কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করুক। ভোটারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ অথবা অসন্তুষ্ট বলেও জরিপে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন পদে ইতিহাস গড়লেন যারা: এবারের নির্বাচনে নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, মুসলিম ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একাধিক নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস জয়ী হয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস হয়েছেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোহোসা রাজ্যটির প্রথম লাতিনো নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন। নিউ মেক্সিকোতে ডেব হালান্ড প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। ওহাইওতে অ্যামি অ্যাক্টন হয়েছেন রাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর।
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটেও তৈরি হয়েছে নতুন নজির। নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জয়ী ক্রিস পাপাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সেনেটর হতে যাচ্ছেন। মিশিগানে জয়ী আবদুল এল-সাইয়েদ প্রথম মুসলিম সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রাজ্যটির প্রথম নির্বাচিত নারী সেনেটর হতে যাচ্ছেন। টেক্সাসে জেমস টালারিকো এবং কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটনের বিজয়ও দলটির জন্য ঐতিহাসিক। কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর কোনো ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত হলেন।
ট্রাম্পের ক্ষমতায় কী প্রভাব পড়বে: নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা সরাসরি কেড়ে নেবে না। তবে আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। ফলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনের উদ্যোগ বাধার মুখে পড়তে পারে। সেনেটে তাঁর প্রশাসনের মনোনীত কর্মকর্তা ও বিচারপতিদের নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে বিরোধীরা। পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও জবাবদিহির চাপ বাড়াতে পারবেন তাঁরা।
রিপাবলিকানদের পরাজয় তাই কেবল আসন হারানোর ঘটনা নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক ক্ষমতার ভারসাম্য, যেখানে প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করেই এগোতে হবে। সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আলজাজিরা।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬