প্যারিসের আকাশে আজন্ম চেনাফ্রেমের বাইরে এক টুকরো বাংলাদেশ। গ্রীষ্মের তীব্র রোদ আর উষ্ণ হাওয়াকে তোয়াক্কা না করে প্যারিসের উপকণ্ঠ সার্সেলের খোলা মাঠটিতে ঢল নেমেছিল হাজারো মানুষের।
ফ্যানদের ভালোবাসার ‘গুরু’ নগর বাউল জেমস মঞ্চে উঠতেই উন্মাদনার পারদ চড়েছিল চরমে। মাথায় সেই পরিচিত গামছা, গলায় ঝুলানো গিটার আর স্বভাবসুলভ উদাসীন ভঙ্গিতে যখন তিনি কর্ডে আলতো ছোঁয়া দিলেন, তখন বেজে ওঠা হৃদয় দোলানো সুরে কোলাহলে ডুবে গিয়েছিল পুরো প্রান্তর।
জেমস গেয়ে উঠলেন—‘কবিতা, তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে...’। ব্যস, তাতেই প্যারিসের এই উন্মুক্ত মাঠ রূপ নিয়েছিল সুদূর বাংলার এক জীবন্ত ক্যানভাসে। ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট ২০২৬-এর এই মহোৎসবে যোগ দিতে প্যারিসে এসেছিলেন জেমস। সার্সেলের খোলা মাঠটি তখন কানায় কানায় পূর্ণ।
প্রায় তিন হাজারেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি জড়ো হয়েছিলেন গুরুকে এক নজর দেখতে। অনেকে এসেছিলেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। প্রবাসের মাটিতে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে প্রিয় শিল্পীকে তুলে ধরে বাবারা যেন চোখের জলে ও উদযাপিত আবেগে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন—এই মানুষটিই তাদের যৌবনের দিনগুলোকে রঙিন করে রেখেছিল।
কালজয়ী ‘কবিতা’ গানটি দিয়ে যখন সুরের ঝংকার তুলেছিলেন জেমস, তখন মাঝবয়সী শ্রোতারা হারিয়ে গিয়েছিলেন ফেলে আসা সুদূর অতীতে।
বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে শোনা সেই চেনা গানগুলোর সঙ্গে বিদেশের মাটিতে এভাবে দেখা হবে, হয়তো ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবেননি। নগর বাউলও যেন শ্রোতাদের সেই নস্টালজিয়ায় ফেরানোর পণ করেই মঞ্চে নেমেছিলেন।
একে একে গেয়ে শুনিয়েছেন তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো—‘সুলতানা বিবিয়ানা’, ‘ও বিজলি চলে যেওনা’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘ওরে ওরে হাওয়া থামনারে’, ‘দুই দিনেরই এক জেল’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘দিওয়ানা মাস্তানা’ এবং ‘গুরু’।
শুধু সুরের মূর্ছনা নয়, এই পুরো আয়োজনজুড়েই বজায় ছিল শতভাগ বাঙালিয়ানার সুবাস। মেলা প্রাঙ্গণে বসা বিশটিরও বেশি স্টলে হরেক রকমের খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন উদ্যোক্তারা।
ভিনদেশি মাটিতে সিঙ্গাড়া, সমুচা, বিরিয়ানি, হরেক স্বাদের পিঠা-পুলি, ঝালমুড়ি আর ফুচকার গন্ধে মেতে উঠেছিল পুরো প্রান্তর।
একপাশে পান-সুপারির ঐতিহ্যবাহী স্টল আর প্রচণ্ড দাবদাহে তৃষ্ণা মেটাতে ঠাণ্ডা পানীয় জল, ডাবের পানি, হরেক রকমের ফল ও লাচ্ছির সুব্যবস্থা মন কেড়েছিল সবার।
জেমসের জাদুকরী পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সুরের আবেশ ছড়িয়েছেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যান্ড ‘জলের গান’ এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বাংলাদেশি শিল্পী বিন্তি। বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সার্সেলের উপ-মেয়রসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে আয়োজক শাহ গ্রুপের কর্ণধার সাত্তার আলী সুমন জানান, ২০২৩ সালেই এই উৎসব করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ফ্রান্সের তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত রাখতে হয়েছিল।
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবারের এই সফল আয়োজন প্রমাণ করেছে যে, প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে বাঙালিরা এমন একটি মিলনোৎসবের জন্যই মুখিয়ে ছিলেন।
সুর, স্মৃতি আর বাঙালির চিরায়ত আড্ডায় মুখর হয়ে থাকা সেই বিকেলে প্যারিসের আকাশেও যেন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল নগর বাউলের সেই চিরচেনা দীপ্ত সুর।
ডিসি/আপ্র/০৩/০৮/২০২৬