মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুন জ্বলছে, তা কেবল একটি দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়-তা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক ন্যায়বোধের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বরাজনীতির এক গভীর অন্ধকার অধ্যায়। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত বিমান হামলা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক আচরণ হতে পারে না। এটি শক্তির দম্ভে আইনকে অগ্রাহ্য করার নির্মম দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথার্থভাবেই এ হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে নিন্দা জানিয়েছে। আমরা সেই অবস্থানকে শুধু সমর্থনই করি না-বরং আরো দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এই ধরনের টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি। রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে সামরিক আঘাতে নিশ্চিহ্ন করা যদি বৈধতার আবরণ পায়, তবে বিশ্বব্যবস্থা আর আইনভিত্তিক থাকবে না; তা পরিণত হবে শক্তিশালীদের ইচ্ছার ওপর দাঁড়ানো এক অনিশ্চিত অরাজকতায়।
ইতোমধ্যে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অসংখ্য বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে। স্কুলে শিশুদের মৃত্যু, নগরজুড়ে আতঙ্ক, শরণার্থী হওয়ার আশঙ্কা-এসবই প্রমাণ করে যুদ্ধ কখনোই সীমাবদ্ধ থাকে না ঘোষিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে। মানবাধিকার, মানবিক আইন ও ন্যূনতম নৈতিকতার সীমারেখা প্রতিদিন লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রতিশোধের ভাষা যত উঁচু হচ্ছে, ততই শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।
এই ঘটনাকে কেউ কেউ ‘কৌশলগত সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কার জন্য এই সাফল্য? যদি একটি হত্যাকাণ্ড আরো বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বার উন্মুক্ত করে, তবে তা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আগ্রাসন কখনো স্থায়ী শান্তি আনে না; বরং নতুন সংঘাতের বীজ বপন করে।
বিশ্বের ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এই দৃষ্টান্ত বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক আইনই তাদের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র সুরক্ষা। যদি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো একতরফাভাবে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের পথ বেছে নেয়, তবে বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন কূটনীতি নয়, নিরস্ত্র জাতিগুলোর ওপরই নেমে আসবে অনিশ্চয়তার বোঝা।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই-আমরা যুদ্ধের পক্ষে নই। কোনো পক্ষের প্রতিশোধপরায়ণতা বা শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিও সমর্থন করি না। সংঘাতের স্থায়ী সমাধান কেবল সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই সম্ভব। জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর এখনই দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া উচিত-অগ্নিসংযোগ নয়, উত্তেজনা প্রশমনই হোক অগ্রাধিকার।
আজ প্রয়োজন বিশ্ববিবেকের জাগরণ। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; তা অন্যায়ের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন। আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করে যে আগ্রাসনের পথ খোলা হয়েছে, তা যদি এখনই থামানো না যায়, তবে আগামী দিনের পৃথিবী হবে আরো অস্থিতিশীল, আরো সহিংস।
শক্তির অহংকারের বিপরীতে মানবতার কণ্ঠস্বর তুলতেই হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত পৃথিবী টিকে থাকে আইনের ওপর, ন্যায়ের ওপর-বোমার ওপর নয়।
সানা/আপ্র/৩/৩/২০২৬