বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ, দারিদ্র্যমুক্ত ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গঠার লক্ষ্য নিয়ে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয়, অবদানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরেও সব কর্মক্ষম নাগরিককে পেনশন সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সম্প্রতি রাজধানীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো টেকসই পেনশন সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আগে সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে অধিকাংশ মানুষের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। এখন বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী, প্রবাসী বাংলাদেশিসহ কর্মক্ষম নাগরিকরা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই স্কিম সামাজিক সুরক্ষাকে প্রচলিত কল্যাণভিত্তিক ধারণা থেকে অবদানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থা থেকে এর পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি পেনশন অ-অবদানভিত্তিক এবং কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রযোজ্য। অন্যদিকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত চাঁদা জমা দিয়ে ৬০ বছর পূর্তির পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পান।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় চার লাখ মানুষ সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধিত হয়েছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে চার কোটি মানুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিবন্ধন ও অংশগ্রহণ বাড়াতে ৪৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ, নগদ ও টেলিটকের মাধ্যমে চাঁদা জমা দেওয়ার সুবিধা চালু হয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, বিভিন্ন এনজিও ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য চারটি পৃথক স্কিম চালু রয়েছে। এগুলো হলো—প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাস’, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য ‘প্রগতি’, স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য ‘সুরক্ষা’ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘সমতা’।
সমতা স্কিমে একজন গ্রাহক মাসে ৫০০ টাকা জমা দিলে সরকার সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে মোট এক হাজার টাকার মাসিক চাঁদা নিশ্চিত করে। আর প্রগতি স্কিমে কর্মী ও নিয়োগকর্তা যৌথভাবে চাঁদা প্রদান করেন।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশন তহবিল পরিচালনার প্রশাসনিক ব্যয় সরকার বহন করে। ফলে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা সরাসরি গ্রাহকের হিসাবে যুক্ত হয়। মাসিক চাঁদার বিপরীতে কর রেয়াত, পেনশনের অর্থ আয়করমুক্ত সুবিধা এবং ৬০ বছর পূর্তির পর পেনশন তহবিলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগও রয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ এবং সরকার অনুমোদিত বিনিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও স্বল্প-ঝুঁকিপূর্ণ খাতে, বিশেষ করে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তহবিলের পরিধি বাড়লে ঝুঁকি ও মুনাফার ভারসাম্য বিবেচনায় বিনিয়োগ আরো বহুমুখী করা হবে।
ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় ইসলামিক পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রয়োজনীয় কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়নের কাজ করছেন।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, নতুন এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আস্থা তৈরি করা। তবে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা এবং ধারাবাহিক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এ আস্থা আরো শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি কর্মক্ষম নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়া উচিত। নিয়মিত ছোট ছোট সঞ্চয়ই ভবিষ্যতের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
এসি/আপ্র/২৩/০৭/২০২৬