গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

চতুর্থ দিনেও অচল সাজেক সড়ক, পর্যটন ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে

জেলা প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি

জেলা প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি

প্রকাশিত: ১৩:৪০ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৪:৪৮ এএম ২০২৬
চতুর্থ দিনেও অচল সাজেক সড়ক, পর্যটন ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

সড়করাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। অবরোধকারী সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।অন্যদিকে অবরোধ ও সাম্প্রতিক সংঘর্ষের জেরে পর্যটনকেন্দ্র সাজেক কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে যান চলাচল ও উজোবাজার এলাকার অধিকাংশ দোকানপাট।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহার এবং সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।

গত ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজার এলাকায় অবরোধ চলাকালে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনার পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। সেদিন সাজেকে বেড়াতে যাওয়া প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়ার আশঙ্কায় পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তা প্রহরায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সংঘর্ষের পর থেকে সাজেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

এদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ২২ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিবাদে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা অবিলম্বে দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত; উজোবাজারে দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সেখান থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া; আহত নারী-পুরুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন; জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করা; আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ এবং তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি না চালানো।সংগঠন দুটির নেতারা দাবি করেছেন, উজোবাজার এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।সাজেকের বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। গত ১১ অক্টোবরও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছিল। সেসময় সাজেকে সশস্ত্র সদস্যদের অবস্থান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে সংগঠন দুটি বিভিন্ন দাবি জানায়। অবরোধের কারণে সাজেক ও খাগড়াছড়ির মধ্যে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বহু পর্যটক আটকা পড়েন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্যোগে আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ শিথিল করা হলে সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াত আবার শুরু হয়। তবে ২২ অক্টোবর থেকে নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় পর্যটন কার্যক্রম ফের স্থবির হয়ে পড়ে।অবরোধকারীদের দাবি, তাদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় কর্মসূচি পুনরায় শুরু করতে হয়েছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধে স্থানীয় জনজীবন ও পর্যটন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।গত ২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন। ঘটনার পর পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।বর্তমানে সাজেক সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে। তবে নিরাপত্তা টহল থাকলেও অবরোধের কারণে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। উজোবাজারের দোকানপাট বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে সাজেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের ডাকা অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে দুই জেলার কিছু সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলেও কর্মসূচি শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে সাজেকের মূল সড়কের অবরোধ বহাল থাকায় পর্যটনকেন্দ্রটির যোগাযোগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সাজেকের অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটননির্ভর। রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় দোকানপাট ও পর্যটকসেবার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।পর্যটকদের বুকিং বাতিল, পরিবহন বন্ধ এবং রিসোর্ট-কটেজে অতিথি না থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, পর্যটন খাতে কর্মরত কর্মচারী, গাড়িচালক, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারীরাও সংকটে পড়েছেন। অবরোধের কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে সাজেকের সংকট এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবরোধকারী সংগঠনগুলোর উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সংঘর্ষের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ যাচাই, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু, পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করতে প্রশাসনিক সমন্বয় জরুরি। তবে অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে দুই সংগঠনের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং পর্যটনকেন্দ্র পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কী- এসব বিষয়ে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে সংকটের বর্তমান চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

সাজেকের সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনার ওপর। অবরোধের চতুর্থ দিনেও সেই সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।এ বিষয়ে সাজেক রিসোর্ট কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জাগো নিউজকে বলেন, সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত রয়েছে এবং পর্যটকদের ভ্রমণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার কোনো উদ্যোগ দেখছি না।রাঙামাটির পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব জানান, অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।অবরোধকারী দুটি সংগঠনের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি-না সে বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রবারণা পূর্ণিমায় চট্টগ্রামে ভক্তদের ঢল, সন্ধ্যায় ফানুস উৎসব
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রবারণা পূর্ণিমায় চট্টগ্রামে ভক্তদের ঢল, সন্ধ্যায় ফানুস উৎসব

কারও হাতে পদ্মফুল, কারও হাতে ফলমূল ও পূজার উপকরণ। কেউ বুদ্ধমূর্তির সামনে ফুল নিবেদন করছেন, কেউ আবার...

গোপালগঞ্জে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর
২৫ অক্টোবর ২০২৬

গোপালগঞ্জে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মিছিল থেকে পুলিশ সদস্যদের মারধর ও পুলিশের গাড়ি ভাঙ...

আইজিপির সফরের মধ্যেই যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ, খুলনায় নয় মাসে ৬৮ হত্যাকাণ্ড
২৫ অক্টোবর ২০২৬

আইজিপির সফরের মধ্যেই যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ, খুলনায় নয় মাসে ৬৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সফরের মধ্যেই তেরখাদা উপজেলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছ...

শ্রীপুরে পুলিশ কনস্টেবলসহ তিনজন আটক, ১২০ পিস ইয়াবা উদ্ধার
২৪ অক্টোবর ২০২৬

শ্রীপুরে পুলিশ কনস্টেবলসহ তিনজন আটক, ১২০ পিস ইয়াবা উদ্ধার

গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদক সেবনের অভিযোগে এক পুলিশ কনস্টেবলসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁদের ভাড়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই