গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

নিবন্ধ===

হেমন্তের হৈমন্তী

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২০ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৮ এএম ২০২৬
হেমন্তের হৈমন্তী
ছবি

ছবি সংগৃহীত

পূর্ণিয়া সামিয়া

ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি ভিন্ন বৈচিত্র্যে হাজির হয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্যের সঙ্গে আমাদের মনেও বৈচিত্র্য আসে। শরতের সাদা মেঘের ভেলায় ভাসতে ভাসতে কখন কার্তিকের আকাশে স্নিগ্ধতার মাধুরী নিয়ে হাজির হয়, তা হেমন্তই জানে।

প্রকৃতি কন্যা হেমন্তের রূপ বাংলার মানুষের কাছে খুব চেনা। আশ্বিন পেরিয়ে কার্তিক এলেই যেন ঘরে ঘরে নবান্নের ধূম পড়ে যায়। এর পরেই যেহেতু শীতকাল, তাই এ মাস থেকেই শীতের আগমনী বার্তা জোরেসোরেই বোঝা যেতে থাকে।

হেমন্তের রাতে অসংখ্য তারায় ভরে থাকে আকাশ। আর সকালের হালকা কুয়াশায় ভেজা শিউলি ঝরা উঠোন দেখে যে কেউ মনের সুখে গেয়ে ওঠে—

‘শিউলি ফুল, শিউলি ফুল, কেমন ভুল, এমন ভুল॥
রাতের বায় কোন্ মায়ায় আনিল হায় বনছায়ায়,
ভোরবেলায় বারে বারেই ফিরিবারে হলি ব্যাকুল॥’

হেমন্তকে বলা হয় পাকা ধানের ঋতু। সকালের প্রথম সূর্যের আলো যখন পাকা ধানের ওপর ঝলমলিয়ে খেলে যায়, তখন যেন সোনালি আলোয় উদ্ভাসিত হয় বাংলার মাঠঘাট। সে খুশির আলো বিচ্ছুরিত হয় কৃষকদের ঘরে ঘরে; চারপাশ থাকে উৎসবমুখর। একদিকে যেমন হেমন্তের হিমেল বাতাস কনকনে শীতের আগাম সতর্কবার্তা ঘোষণা করে, অন্যদিকে এ সময়ে প্রকৃতি অন্য রকম সাজে সেজে ওঠে।

বর্ষার জল শুকিয়ে মাঠঘাট, ফসলের জমি হয়ে ওঠে অনুপম। এই রূপের টানেই তো ‘তিমির হননের কবি’ বা ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে পরিচিত জীবনানন্দ দাশ বারবার তার কবিতায় হেমন্তকালকে এনেছেন। তিনি কার্তিকের নবান্নের দেশে কবিতায় বারবার ফিরে আসার আকুতি জানিয়েছেন। এ রূপের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে কবি তার ‘একটি নক্ষত্র আসে’ কবিতায় লিখেছেন—

‘একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চলে
ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে
সে আসবে মনে হয়;- আমার দুয়ার অন্ধকারে।’

হেমন্তকালের একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এ সময় আকাশ থাকে নিটোল নীল। কোথাও কোথাও কোদালি মেঘ, কোথাও সাদা ভেলা; কোনো মেঘ নেই একআনা, কোনো ভার নেই, গর্জন নেই, বিজলি নেই, গোমড়া মুখ করে বসে থাকা নেই, থেমে থাকা নেই- যেন হাতের কাছেই কাচ-স্বচ্ছ তুলো, যেন মই বেয়ে একটু ওপরে উঠলেই হাতে ধরা যাবে! এ তো হেমন্তেরই গুণ।

সত্যি কথা বলতে, নয়ন আছে যাদের, তারা দেখে হেমন্তের অপরূপ রূপের বৈভব। তারা উপভোগ করে হেমন্তের সংস্কৃতি। যদিও শহরে হেমন্তের প্রকৃত রূপ দেখা যায় না, হেমন্ত এখানে নিজেকে খোলার সুযোগ পায় না; কিন্তু গভীর গ্রামে এখনো হেমন্ত ধানের শোভায়, গানের শোভায়, উৎসবের শোভায়, পার্বণের শোভায়, নবান্নের শোভায় ফুটে ওঠে। সেখানে সোনালী পাকা ধানের শীষে দোল খাওয়া বাতাস যেন নেচে নেচে গেয়ে যায়- ‘আজি ধানের ক্ষেতে, রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলারে ভাই লুকোচুরি খেলা।’

হেমন্তের রূপের আকুতি পাওয়া যায় মধ্যযুগের কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলি ছুঁয়ে, গোবিন্দ দাস পেরিয়ে আধুনিক কালের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে ছাড়িয়ে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক এবং সময়ের তরুণতম কবির কলমেও। যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য হেমন্তের কবিতা। প্রতি বছর নানা জায়গায় হেমন্ত উৎসব উদযাপিত হয়; হেমন্ত মেলা বসে গঞ্জে, ঘাটে, সড়কে, মোড়ে। এখনো হেমন্তের অবশিষ্ট আমেজ দেখা যায় প্রকৃতির মাঝে।

হয়তো মানুষের আগ্রহ কমেছে ঋতুর বৈচিত্র্যে, প্রয়োজন কমেছে ঋতুভিত্তিক কর্মে; নাগরিক মস্তিষ্ক, নগর ইট-কাঠ, কারখানা, নগদ অর্থ ভুলিয়েছে ঋতুর রীতি-নীতি। তথাপি প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে, সূচি মাফিক নিয়ে আসে ঋতুর এক একটি পর্ব, ধাপে ধাপে বদলায় তার বৈশিষ্ট্য। এর থেকে বদলানো যাবে না—যতই বদল হোক সভ্যতা, বদল হই আমরা।

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

কেএমএএ/আপ্র/৩০.১০.২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস মানব চরিত্রের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ
৩০ অক্টোবর ২০২৬

জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস মানব চরিত্রের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ

বিখ্যাত ব্যঙ্গ রচনা ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ প্রকাশের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়ারল্যান্ডে চলছে নানা আয়োজন...

অকারণ ভালোবাসা
৩০ অক্টোবর ২০২৬

অকারণ ভালোবাসা

কবিতা===

শিউলি-মালা
৩০ অক্টোবর ২০২৬

শিউলি-মালা

কবিতা===

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই