আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসিকে ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস’ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় আস্তুরিয়াস অঞ্চলের রাজধানী ওভিয়েদোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্সেস লিওনরের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল কিংবদন্তি।
গত জুনে মেসিকে এ পুরস্কারের জন্য বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলী তাঁর বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রশংসা করে তাঁকে ‘সর্বকালের সবচেয়ে সফল ফুটবলার’ হিসেবে অভিহিত করে। একই সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদানেরও স্বীকৃতি দেয়।
পুরস্কার গ্রহণকে কেন্দ্র করে স্পেনের ওভিয়েদো শহরে মেসিকে ঘিরে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁকে স্বাগত জানাতে শহরের রাস্তায় ভিড় করেন হাজারো মানুষ। এই উন্মাদনা ২০২৩ সালে হলিউড অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের ওভিয়েদো সফরকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’।
প্রিন্সেস লিওনরের মুখে মেসির প্রশংসা
ওভিয়েদোর ক্যাম্পোয়ামোর থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ব্যাগপাইপ ও ড্রামের সুর এবং আর্জেন্টিনার জার্সি পরা সমর্থকদের উল্লাসের মধ্য দিয়ে পৌঁছান মেসি। মঞ্চে প্রিন্সেস লিওনরের কাছ থেকে পুরস্কারের সনদ গ্রহণ করেন তিনি। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে পুরস্কারজয়ীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মেসির ফুটবলজীবন ও নেতৃত্বের প্রশংসা করেন স্পেনের রাজপরিবারের এই সদস্য।
প্রিন্সেস লিওনরের কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন মেসি -এএফপি
প্রিন্সেস লিওনর বলেন, ‘জানি না আর কোনো কিংবদন্তি সবাইকে একই অনুভূতিতে গাঁথতে পেরেছেন কি না। একটি মুহূর্ত, গোলের জন্য সবাই যখন অপেক্ষা করে, তখন সবাইকে এক সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। এ কারণেই মেসির দিকে এবং তাঁর অতুলনীয় ক্যারিয়ারে তাকানোটা অর্থবহ। এটি আমাদের সামনে আর্জেন্টাইন ফুটবলারের এক দারুণ সংজ্ঞা তুলে ধরে।’
মেসির দলগত মানসিকতার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি স্পোর্তিং গিহনের এক সাবেক খেলোয়াড়ের উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন। ওই খেলোয়াড়ের নাম জানা যায়নি। উদ্ধৃতিতে বলা হয়, ‘তিনি মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগে সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং অহংকারকে ছাপিয়ে দলগত চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।’
পুরস্কার পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মেসি লেখেন, ‘ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা দারুণ সম্মানের। সব পুরস্কারজয়ীকে অভিনন্দন, আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে দারুণ সময় কেটেছে।’
বার্সেলোনা থেকে মায়ামি, বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার
মেসির ফুটবলজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে স্পেনের বার্সেলোনায়। ২০০০ সালে ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেওয়ার পর ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার আগ পর্যন্ত ২১ বছর সেখানে কাটান তিনি। এই ক্লাবেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠেন মেসি। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনেও সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার।
বার্সেলোনা ছাড়ার পর দুই বছর ফ্রান্সের প্যারিস সাঁ জার্মাঁয় খেলেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের পাশাপাশি ফুটবলে তাঁর প্রভাব তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৮১ সালে চালু হওয়া ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস’ পুরস্কার স্প্যানিশভাষী বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। এর সঙ্গে ৫০ হাজার ইউরো অর্থমূল্যের পুরস্কার দেওয়া হয়। মানবিক সহাবস্থান, সংহতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রসারে শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এবারের অন্য পুরস্কারজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ লেখক জুলিয়ান বার্নস, মার্কিন মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কোচ এবং সংগীতশিল্পী প্যাটি স্মিথ। ক্রীড়াক্ষেত্রে এর আগে এ পুরস্কার পেয়েছেন টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস ও রাফায়েল নাদাল, ম্যারাথন দৌড়বিদ এলিয়ুদ কিপচোগে এবং মার্কিন স্কিয়ার লিন্ডসে ভন।
রাজকীয় সংবর্ধনায় মেসি
পুরস্কার গ্রহণের পাশাপাশি স্পেনে রাজকীয় সংবর্ধনাও পেয়েছেন মেসি। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে ফেরার আগে স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় অন্য পুরস্কারজয়ীদের সঙ্গে কোভাদোঙ্গা কক্ষে ঐতিহ্যবাহী সংবর্ধনায় অংশ নেন তিনি। রাজা ও রানির পরিবর্তে এবার এককভাবে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন প্রিন্সেস লিওনর।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। মেসির ফুটবলজীবনের উত্তরাধিকার ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘খেলাধুলা ও ফুটবলে মেসি যে ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছেন, তা ব্যতিক্রমী। একজন মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বহু মূল্যবোধের এক অসাধারণ উদাহরণ।’
মেসিকে ঘিরে স্পেনের এই আয়োজন আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরই প্রতিফলন। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় হয়েও স্পেনের রাজপরিবার, ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ সমর্থকদের কাছ থেকে এমন সম্মান পাওয়া তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে যোগ করল নতুন এক অধ্যায়।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬