খান মুহঃ আশরাফুল আলম
সংগীত, নাটক, সিনেমা কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম- যে মাধ্যমেই হোক না কেন, একটি দৃশ্য প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে; যখন মূল শিল্পীর পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীরা তাদের নিপুণ অভিনয়ে প্রেক্ষাপটটি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। অথচ মূলধারার আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রধান তারকারা থাকলেও পর্দার পেছনের এই প্রাণশক্তিগুলো দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত; বিশেষ করে অভিনয়শিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রাপ্তি ও দীর্ঘসূত্রতা বা পারিশ্রমিক বকেয়া রাখার যে সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতিচর্চার অঙ্গনে শিকড় গেড়েছে, তা আজ এক নীরব সংকটে রূপ নিয়েছে।
নাটক বা চলচ্চিত্রের মূল পোস্টারজুড়েই থাকে জনপ্রিয় মুখগুলোর জয়জয়কার। ট্রেলার কিংবা প্রচারণায় তাদের মুখাবয়বই দর্শকের মনে কৌতূহল জাগায়। কিন্তু পর্দার এই চাকচিক্য ও জাঁকজমকের ঠিক পেছনের পৃথিবীটা এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলে। পর্দায় যাদের উপস্থিতি ছাড়া মূল চরিত্রগুলোর আবেগ, অভিব্যক্তি কিংবা গল্পের বাঁকগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে ওই পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পীরাই আজ শোবিজের সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত অংশ। মূল ধারার পরিচিত মুখ বা তারকাদের বিশাল পারিশ্রমিকের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় এই নিঃস্ব মানুষ- যাদের ঘামে-শ্রমে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যকাব্য। আজ নাটক বা চলচ্চিত্রের একটি বড় অংশে অভিনয়ের প্রধান প্রাণশক্তি জুগিয়েও এই শিল্পীরা ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, মাসের পর মাস পারিশ্রমিক বকেয়া রাখার সংস্কৃতি তাদের জীবনযাত্রাকে এক চরম দুর্বিষহ নরকে পরিণত করেছে।
একটি নির্মাণে পরিচালক ও প্রযোজকের ভাবনার সফল রূপায়ণে পার্শ্বশিল্পীদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। নায়ক-নায়িকার অভিভাবক, বন্ধু, প্রতিবেশি কিংবা খল চরিত্রের ডান হাত- এসব বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে শিল্পীরা গল্পকে জীবন্ত করে তোলেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল তারকার চেয়েও শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশি পরিশ্রম করতে হয় এই অভিনেতাদের। শুটিংয়ের দীর্ঘ ঘণ্টা, রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে চরিত্রের প্রয়োজনে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। অথচ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের ভাগ্যে জোটে বৈষম্যমূলক পারিশ্রমিক। এই বৈষম্য কেবল টাকার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক ধরনের অমানবিক মানসিকতা- যেখানে মনে করা হয় পার্শ্বশিল্পীদের কোনো বিকল্প বা নিজস্ব বাজারমূল্য নেই।
বর্তমান সময়ের নাটক ও বিনোদন শিল্পে তারকানির্ভর বিপণন কৌশল এতটাই প্রবল যে, পুরো বাজেটের সিংহভাগ চলে যায় শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন শিল্পীর পকেটে। ফলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজেট সংকটের অজুহাতে পার্শ্বচরিত্রের শিল্পীদের পারিশ্রমিক কমিয়ে দেন কিংবা তা মাসের পর মাস আটকে রাখেন। পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার দীর্ঘসূত্রিতা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা শিল্পীদের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। অভিনয় ছাড়া যাদের জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো স্থায়ী উৎস নেই, তাদের জন্য মাসের পর মাস পারিশ্রমিক না পাওয়া মানে ক্ষুধার জ্বালা আর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া। পেশাদার একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর কাছে অভিনয় কেবল শখ নয়, তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। মাস শেষে বাসাভাড়া, বাজার খরচ, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য নির্ধারিত সময়ে পারিশ্রমিক পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- অনেক সময় জুনিয়র ও পার্শ্বশিল্পীদের একটি কাজ শেষ হওয়ার পর দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় সামান্য কয়টি টাকার জন্য। এই বকেয়া রাখার সংস্কৃতি কেবল যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে, তা নয়; শিল্পীদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। প্রতিনিয়ত আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে একজন শিল্পী কীভাবে সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করবেন, তা এক গভীর প্রশ্ন।
অনেক বয়স্ক ও প্রবীণ অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন- যাদের আজ ওষুধ কেনার মতো সামান্য অর্থটুকুও থাকে না। অর্থাভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে নীরবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার খবরও মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়- যা আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক করুণ ও নির্মম সত্য। এ শোচনীয় পরিস্থিতির পেছনে মিডিয়া পাড়ার জবাবদিহিতার অভাব এবং শক্তিশালী কোনো ট্রেড ইউনিয়ন বা সংগঠনের অনুপস্থিতি অন্যতম প্রধান কারণ। অভিনেতা ও শিল্পীদের অধিকার রক্ষার জন্য কিছু সংগঠন থাকলেও পেশাদার এবং প্রান্তিক পার্শ্বশিল্পীদের স্বার্থ সুরক্ষায় তারা প্রায়ই নিষ্ক্রিয় থাকে। বড় তারকা বা প্রভাবশালী পরিচালকদের প্রভাবের কাছে প্রান্তিক শিল্পীদের কণ্ঠস্বর সব সময়ই চাপা পড়ে যায়। প্রতিবাদ করলে কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে- এই চরম আতঙ্কে তারা মুখ বুঝে সহ্য করেন বঞ্চনার সব গ্লানি। ইন্ডাস্ট্রির এই একপেশে ক্ষমতার কাঠামোয় শিল্পীরা পরিণত হন এক ধরনের আধুনিক পণ্যে- যাদের ব্যবহার শেষে ছুড়ে ফেলা হয়।
সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পারিশ্রমিক বকেয়া বঞ্চনার বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রতিনিয়ত আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের কারণে এই শিল্পীরা চরম মানসিক অবসাদ ও হীনম্মন্যতায় ভোগেন। অথচ দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার কথা ছিল যাদের জীবন, তারা আজ বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন। এই বৈষম্য চলতে থাকলে তরুণ ও মেধাবী তরুণরা এই পেশায় আসতে উৎসাহ হারাবেন- যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সামগ্রিক নাট্য এবং চলচ্চিত্র শিল্পকে মেধাশূন্য করে তুলবে। একটি দেশের সংস্কৃতির শিকড় মজবুত করতে হলে ক্যামেরার পেছনের এবং সামনের প্রতিটি কর্মীর অধিকার রক্ষা করা সমানভাবে জরুরি।
পারিশ্রমিক বকেয়া সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো চুক্তিভিত্তিক কাজের অস্বচ্ছতা ও আইনি সুরক্ষার অভাব। আমাদের দেশে অধিকাংশ নাট্য ও অডিওভিজ্যুয়াল নির্মাণে কোনো আনুষ্ঠানিক এবং আইনিভাবে বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় না। মৌখিক কথার ওপর ভিত্তি করে কাজ শুরু হয় এবং কাজ শেষ হওয়ার পর নানা অজুহাতে পারিশ্রমিক পরিশোধে টালবাহানা শুরু হয়। অনেক সময় প্রযোজক ও পরিচালকদের মধ্যকার অর্থ লেনদেনের জটিলতা বা চ্যানেলের বিল আটকা পড়ার অজুহাত দিয়ে পার্শ্বশিল্পীদের পাওনা পরিশোধ মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়। অথচ মূল তারকারা তাদের পেমেন্ট বুঝে নেওয়ার পরই কেবল ফ্লোরে আসেন- যা এক ধরনের চরম বৈষম্যমূলক ও অনৈতিক চর্চা।
পার্শ্বশিল্পীদের পারিশ্রমিক বকেয়া বঞ্চনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অর্থনৈতিক চাপের মুখে অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এক সময় অভিনয় পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। যারা টিকে থাকেন, তারা প্রতিনিয়ত এক ধরনের আত্মিক ও মানসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যান। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের অভিনয়ের মান ও সামগ্রিক শিল্পোৎপাদনের ওপর। যখন একজন শিল্পীর মাথায় মাস শেষের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খায়, তখন তিনি স্ক্রিপ্ট বা চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে গল্পের বুনন ও চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়- যা দিন শেষে আমাদের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক মানকে নিচের দিকে নামিয়ে দিচ্ছে।
পারিশ্রমিক বকেয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজ জোরালো আওয়াজ তোলার সময় এসেছে। শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ বা সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ। সবার আগে প্রয়োজন মিডিয়ার সব স্তরে একটি সুনির্দিষ্ট ও মানসম্মত চুক্তিনামা প্রবর্তন করা- যেখানে কাজের নির্দিষ্ট সময়, পারিশ্রমিকের পরিমাণ এবং তা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ থাকবে। চুক্তিভঙ্গ হলে আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে- যাতে কোনো প্রযোজক বা প্ল্যাটফর্ম শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানী নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এর পাশাপাশি পরিচালক সংঘ, শিল্পী সংঘ ও প্রযোজক সমিতিকে এক হয়ে একটি শক্তিশালী তদারকি সেল গঠন করতে হবে।
কোনো প্রোডাকশন হাউস যদি নিয়মিত শিল্পীদের পারিশ্রমিক বকেয়া রাখে বা অন্যায়ভাবে কম পারিশ্রমিক দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বয়কট বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। নাট্যকার ও নির্মাতাদেরও উচিত পার্শ্বচরিত্রগুলোকে কেবল ‘ফিলার’ হিসেবে না দেখে তাদের গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং বাজেট বণ্টনে ন্যূনতম সমতা বজায় রাখার মানসিকতা তৈরি করা। বিজ্ঞাপনদাতা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ভূমিকাও এখানে কম নয়। অনেক সময় চ্যানেলগুলো সময়মতো প্রযোজকদের বিল পরিশোধ করে না- যার নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ে শেষপ্রান্তের শিল্পীর ওপর। এই চেইন অব পেমেন্ট বা অর্থপ্রদানের চক্রটিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর উত্থানের ফলে কাজের পরিধি বাড়লেও পারিশ্রমিক বৈষম্য ও বকেয়া রাখার প্রবণতা যে একদম কমে গেছে, তা বলা যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে বড় বাজেটের কাজগুলোতেও এই বৈষম্য আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাই শিল্পীদের এই মৌলিক অধিকার রক্ষা করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, আমাদের সংস্কৃতির স্থায়িত্ব ও মান রক্ষার স্বার্থেও অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত। শ্রম আইন এবং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা যেন কেবল কলকারখানার শ্রমিকদের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সৃজনশীল শিল্পে জড়িত সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পীদের জন্যও এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে কোনো পেশার মানুষই তার শ্রমের নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। শিল্পীদের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিমার মতো বিষয়গুলো নিয়েও এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।
পরিশেষে বলতে চাই, পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পীদের বঞ্চনা ও পারিশ্রমিক বকেয়া রাখার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে। প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী এবং নীতিনির্ধারক- সবারই উপলব্ধি করতে হবে যে, সম্মানজনক পারিশ্রমিক ও সময়মতো পরিশোধ কোনো দয়া নয়, শিল্পীর অধিকার। তারা আমাদের সংস্কৃতির প্রাণভোমরা। তাদের বঞ্চনা ও দুর্বিষহ জীবনযাত্রা আমাদের পুরো মিডিয়া জগতের জন্য একটি নৈতিক পরাজয়। এসব উপেক্ষিত মানুষের মুখে হাসি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের বিনোদন জগতের চাকচিক্য শুধুই একটি নির্মম প্রহসনে পরিণত হবে। সময় এসেছে এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি মানবিক, ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন পেশাদার পরিবেশ গড়ে তোলার, যেখানে প্রতিটি শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬