ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, “আমরা অপেক্ষা করে আছি, আসেন দেশে। দেশে আসেন, দেখা হবে ইনশাআল্লাহ রাজপথে।”
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, “এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, মানি লন্ডারিং, হত্যা, নির্যাতন, আয়নাঘরের মতো ঘটনা ঘটেছে—তবুও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আবার বলা হচ্ছে, ডিসেম্বরে দেশে এসে পদার্পণ করবেন। আমরা অপেক্ষা করে আছি, আসেন দেশে।”
তিনি বলেন, “আপনাদের নির্বাচিত সরকার আমরা। ভুল হলে আমাদের শুধরে দেবেন। আমরা তো আর আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না।”
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হট্টগোলে ক্ষুব্ধ রাষ্ট্রপতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “আজকের এই দৃশ্যটি একেবারেই অনভিপ্রেত। ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। ভুল হলে আমরা সবাই মিলে তা সংশোধন করব। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে।”
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের পর একাংশ অংশগ্রহণকারী আপত্তি জানান। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রামাণ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদ এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এ নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
প্রামাণ্যচিত্র প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, “যে ডকুমেন্টারিতে আবু সাঈদের ছবি নেই, সেটিকে কোনো ডকুমেন্টারি বলা যায় না। আবু সাঈদ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতিচ্ছবি, প্রতীক।”
তিনি বলেন, “খালেদা জিয়ার ছবিও সেখানে থাকা উচিত ছিল। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছেন। এরপর আমাদের শান্ত থাকা উচিত ছিল।”
‘ভুয়া’ স্লোগানে অসন্তোষ
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে স্লোগান ও বিশৃঙ্খলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “বক্তব্য দেওয়ার সময় কেউ ভুয়া ভুয়া বলে চিৎকার করে—রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কি এগুলো মানায়? কবে আমরা শিখব? এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার। তবে সেই ভিন্নমত প্রকাশে শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখা প্রয়োজন।
‘দুই যুদ্ধের’ স্মৃতি তুলে ধরলেন রাষ্ট্রপতি
নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, “২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সংগ্রাম করব।”
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম। এ ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য নয়। আমরা রক্ত দিয়েছি এই দেশের জন্য।”
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, উভয় ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল।
তিনি বলেন, “যতদিন দেশে গণতন্ত্র থাকবে এবং সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিনই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে।”
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের দায়িত্বের কথা
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের পাশে থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সম্মান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, অঙ্গ হারিয়েছেন—তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।”
নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, “মতের ভিন্নতা থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।”
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শ নিয়ে চলমান বিতর্ক।
বন্ধু, এই ভার্সনে **শিরোনাম ও প্রথম অনুচ্ছেদেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তাটি সামনে আনা হয়েছে**। তবে পুরো রিপোর্টে ভারসাম্য রাখতে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলের ঘটনা ও বিতর্কের কারণও রাখা হয়েছে, যাতে এটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার জন্য উপযোগী হয়।
সানা/আপ্র/৫/৮/২০২৬