সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৬৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বুধবার (৭ অক্টোবর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে গঠিত সেলের পঞ্চম সভায় এ তথ্য জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বৃক্ষরোপণ সেলের সভাপতি নজরুল ইসলাম খান। উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ।
সভায় বৃক্ষরোপণের অগ্রগতির পাশাপাশি রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যা, চারার বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বৃক্ষরোপণ শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। এ আন্দোলন সফল করতে জনসম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা দেওয়ার সময় গাছের চারা উপহার দেন এবং সবাইকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেন উল্লেখ করে তিনি কর্মসূচি সফল করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে কোনো অনিয়ম ও অনাচার সহ্য করা হবে না বলেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন তিনি।
পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রাকৃতিকভাবেই কিছু চারা মারা যাবে। তাই আগামী চার বছরের পরিকল্পনায় চারার মৃত্যুর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এ জন্য নার্সারির সক্ষমতা বাড়াতে বন অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন তিনি।
কোন জেলায় কোন ধরনের গাছ উপযোগী এবং গাছের অর্থনৈতিক মূল্য কত - এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বৃক্ষরোপণ করার ওপরও গুরুত্ব দেন পরিবেশমন্ত্রী।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া ও ভূমিরূপ বিবেচনায় নিয়ে বৃক্ষরোপণ করা হলে গাছের বেঁচে থাকার হার বাড়ানো সম্ভব। এ বিবেচনায় আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উপকূলীয় এলাকায় ২ কোটি কেওড়া গাছের চারা রোপণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না; রোপিত চারার পরিচর্যা, সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় পুনঃরোপণ এবং বেঁচে থাকার হার নিশ্চিত করতে হবে। আগামী চার বছরের কর্মপরিকল্পনায় রোপণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে কোথায় কী পরিমাণ চারা রোপণ করা হচ্ছে, সেই তথ্য সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশনা দেন তিনি।
সভায় উপস্থাপিত অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৫৭ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। নির্ধারিত ছকে তথ্য দেওয়া ১১টি দপ্তরের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৪ লাখ এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫২ লাখ ৯৩ হাজার চারা রোপণের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ করছে। এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়টি দপ্তর ইতোমধ্যে তাদের নিজ নিজ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে উপকূলীয় এলাকায় বন অধিদপ্তরের মাধ্যমে আরো ২ কোটি ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চলতি বছরের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর নির্ধারিত ছকে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংগঠনগুলোর বৃক্ষরোপণের তথ্যও একই কাঠামোর আওতায় সংগ্রহ করে সমন্বিত হিসাব তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা সভায় তুলে ধরা হয়।
শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে যুক্ত করতে নেওয়া ‘ওয়ান ট্রি ওয়ান চাইল্ড’ উদ্যোগের অগ্রগতিও সভায় পর্যালোচনা করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় যথাক্রমে ৬ কোটি ১৫ লাখ, ৫ কোটি ৪ লাখ এবং ২ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
বৃক্ষরোপণের তথ্য সংরক্ষণ ও মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার ও ড্যাশবোর্ড তৈরির অগ্রগতিও সভায় পর্যালোচনা করা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণে কর্মশালা আয়োজন, তথ্য সংগ্রহের অভিন্ন কাঠামো নির্ধারণ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞের সহায়তায় সম্ভাব্যতা ও ব্যয় যাচাইয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়।
সভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম অনলাইনে যুক্ত হন। সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবি মতামত দেন। তারা বৃক্ষরোপণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের আওতায় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৮/১০/২০২৬