একটি জার্সি, একটি দশ নম্বর, একটি জাতির অগণিত স্বপ্ন-আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম লিওনেল মেসি। বুয়েনস আয়ার্সের স্মরণীয় রাতটিতে সেই দীর্ঘ গল্পের একটি অধ্যায়ের শেষ হলো। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবার মাঠে নেমে গোল করলেন, দুটি গোল করালেন, আর্জেন্টিনাকে ৩-০ ব্যবধানে জেতালেন; তারপর মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বিদায় জানালেন নিজের দেশকে। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে মেসি যেন ফুটবলকে বিদায় দিলেন তাঁর নিজের মতো করেই-মাঠে জাদু, শেষে গভীর আবেগ।
বেনিনের বিপক্ষে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টালে ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে ছিল মেসির ২০৮তম ও শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা করেছেন একটি গোল, পাশাপাশি নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজের গোলের পেছনে সরাসরি অবদান রেখেছেন। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর ১২৬তম। জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ ও গোল - দুটিতেই তিনি দেশের সর্বকালের শীর্ষে।
প্রথমার্ধে গোল না পেলেও আর্জেন্টিনার আক্রমণ ছিল ধারাবাহিক। মেসি নিজেও একাধিকবার সুযোগ তৈরি করেন। বিরতির পর ৪৮ মিনিটে তাঁর নেওয়া কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। ৬১ মিনিটে নিকো পাজের গোলেও ছিল মেসির অবদান। এরপর পেনাল্টি পেয়ে নিজেই এগিয়ে আসেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে পাঠিয়ে ৩-০ করেন তিনি।
কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশির পর ফুটবল যেন গৌণ হয়ে গেল। জাতীয় সংগীতের সময় তিন সন্তানকে পাশে নিয়ে মেসি আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। চোখের পানি মুছতে মুছতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। মাঠে ছিল বিশাল দশ নম্বর জার্সি, তার ওপরে লেখা বিদায়ী কৃতজ্ঞতার বার্তা। ম্যাচের দশম মিনিটে খেলা থামিয়ে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘ করতালিতে তাঁকে সম্মান জানান। পরে আলো, আতশবাজি, সংগীত ও বিশেষ প্রদর্শনীতে পুরো মনুমেন্টাল পরিণত হয় মেসিকে ঘিরে এক বিশাল বিদায়ী উৎসবে।
বিদায়ী বক্তব্যে মেসির কণ্ঠে ছিল গর্ব, কৃতজ্ঞতা আর বিচ্ছেদের কষ্ট। দুই দশকের বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারাকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই জার্সির জন্য কখনো লড়াই থামাননি, নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে ফিরতে না পারার ভাবনাটি তাঁর জন্য গভীর বেদনার। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়কে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই বিদায়ের মধ্যে ব্যক্তিগত শোকের ছায়াও ছিল। সম্প্রতি বাবা হোর্হে মেসিকে হারিয়েছেন তিনি। বিদায়ী রাতে আবেগে ভেঙে পড়ে বাবার কথাও স্মরণ করেন মেসি। পরিবারকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর চোখের পানি যেন বলে দিচ্ছিল, এই বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের নয়; এটি তাঁর জীবনের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে আবেগঘন সম্পর্কগুলোর একটির সমাপ্তি।
অথচ মেসির আর্জেন্টিনা-অধ্যায়ের শুরুটা এমন ভালোবাসায় ভরা ছিল না। একসময় তাঁকে ঘিরে ছিল তীব্র সমালোচনা। ক্লাব ফুটবলে তাঁর অতিমানবীয় সাফল্যের সঙ্গে জাতীয় দলের পারফরম্যান্স তুলনা করে প্রশ্ন উঠত তাঁর দেশপ্রেম নিয়েও। কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর ব্যর্থতা, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার এবং ২০১৬ সালের হতাশা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। একপর্যায়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে গল্পটাই বদলে দেন তিনি।
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় সেই পুনর্মিলনের নতুন অধ্যায়। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক শিরোপা এবং পরবর্তী সাফল্যে মেসি পরিণত হন আর্জেন্টিনার মানুষের অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার প্রতীকে। যে মানুষটিকে একসময় দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে তুলনার চাপে পড়তে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনিই নিজের আলাদা কিংবদন্তি তৈরি করেন।
২০২৬ বিশ্বকাপও তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়কে আরো মহিমান্বিত করেছে। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের কঠিন লড়াই পেরিয়ে ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয় দলটি। শেষ পর্যন্ত শিরোপা না পেলেও বিদায়ের আগে মেসি সেই ম্যাচ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ফাইনালে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি; দল নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াই খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটাই ক্লান্ত করে দিয়েছিল বলেও জানান তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল এবং ৭০টি সহায়তা - সংখ্যাগুলোই বলে দেয় তাঁর প্রভাব কতটা গভীর। তবে মেসির উত্তরাধিকার কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একটি হতাশ জাতিকে আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, ব্যর্থতার পরও ফিরে দাঁড়ানোর অর্থ দেখিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
মনুমেন্টালের সেই রাতে তাই বিদায় বলতে গিয়ে মেসি একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে কেঁদেছে একটি প্রজন্ম, যে প্রজন্ম তাঁর গোল দেখে বড় হয়েছে, তাঁর ব্যর্থতায় কেঁদেছে, তাঁর প্রত্যাবর্তনে আশাবাদী হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসে রাস্তায় নেমেছে। আর্জেন্টিনার আকাশে আলো জ্বলেছে, গ্যালারিতে উঠেছে অশ্রু আর করতালি, আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই মানুষটি - দশ নম্বর জার্সির মেসি।
শেষ ম্যাচেও তিনি গোল করেছেন। শেষ ম্যাচেও সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন। শেষ ম্যাচেও দল জিতেছে। এর চেয়ে সুন্দর বিদায় হয়তো একজন ফুটবলারের জন্য আর হতে পারে না। মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখলেন; কিন্তু সেই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর গল্প, তাঁর জয়, তাঁর অশ্রু আর কোটি মানুষের ভালোবাসা-সেসব থেকে গেল চিরকাল। বিদায় মেসি। কিংবদন্তিরা আসলে কখনো বিদায় নেন না।
সানা/আপ্র/৮/১০/২০২৬