এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। ভালো ফল হলে পরিবারে আনন্দ, ফোনে শুভেচ্ছার বন্যা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন- সব মিলিয়ে চারপাশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মন খারাপ থাকতে পারে। ফল ভালো হওয়ার পরও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও ভালো করার আফসোস কিংবা অন্যের ফলের সঙ্গে নিজের ফল তুলনা করার প্রবণতা তাদের আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরীক্ষার চাপ হঠাৎ শেষ হওয়ার পর এমন মিশ্র অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
প্রত্যাশার চেয়ে কম হলেই মন খারাপ: অনেক শিক্ষার্থী নিজের জন্য খুব উঁচু লক্ষ্য ঠিক করে রাখে। হয়তো জিপিএ-৫ পেয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে কোনো একটি বিষয়ে আরও ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব ছিল। আবার কেউ ভাবছে, ‘আমি তো আরও ভালো করতে পারতাম’। ভালো ফলের মধ্যেও এই অপূর্ণতার অনুভূতি আনন্দ কমিয়ে দিতে পারে; বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজের ফলাফলকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখে এসেছে, তাদের কাছে একটি নম্বরও অনেক বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। অথচ পরীক্ষার ফলাফল একজন মানুষের সম্পূর্ণ সক্ষমতা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না।
এরপর কী হবে ভয়ও কাজ করে: এসএসসি শেষ মানেই জীবনের একটি পরিচিত অধ্যায় শেষ। এরপর কলেজ, নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু এবং নতুন ধরনের পড়াশোনা। এই পরিবর্তন অনেকের মধ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি ভয়ও তৈরি করতে পারে। ‘কোন কলেজে ভর্তি হব?’, ‘নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে পারব তো?’, ‘এইচএসসিতে ভালো করতে পারব তো’ -এমন নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে পারে। ফলে ফল ভালো হওয়ার আনন্দের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও একসঙ্গে কাজ করে।
অন্যের সঙ্গে তুলনা আনন্দ নষ্ট করে: রেজাল্টের দিন সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তুলনা। কে কত নম্বর পেল, কে জিপিএ-৫ পেল, কার কোন বিষয়ে বেশি নম্বর-এসব আলোচনা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্যের ছবি দেখেও নিজের ফলকে কম মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিস্থিতি, প্রস্তুতি, আগ্রহ ও লক্ষ্য আলাদা। অন্যের ফল দিয়ে নিজের সাফল্যের মূল্য নির্ধারণ করলে নিজের অর্জনটিই ছোট হয়ে যায়।
দীর্ঘদিনের চাপ শেষ হওয়ার পরও অস্বস্তি থাকতে পারে: পরীক্ষার আগে দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা, রুটিন, কোচিং, পরীক্ষা ও ফলের অপেক্ষা, সবকিছুর মধ্যে একজন শিক্ষার্থী মানসিকভাবে চাপের মধ্যে থাকে। ফল প্রকাশের পর সেই ব্যস্ততা হঠাৎ থেমে গেলে একধরনের শূন্যতাও তৈরি হতে পারে। এতদিন যে প্রশ্ন ছিল ‘রেজাল্ট কী হবে’, ফল প্রকাশের পর সেটি বদলে যায় ‘এবার কী করব’তে। তাই আনন্দের পাশাপাশি অস্থিরতা অনুভব করাও স্বাভাবিক।
মা-বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: ভালো ফল করার পরও যদি সন্তান চুপচাপ থাকে বা মন খারাপ করে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে ‘এত ভালো ফল করেও মন খারাপ কেন’ বলে চাপ দেওয়া উচিত নয়; বরং তার কথা মন দিয়ে শোনা দরকার। সন্তানের ফল নিয়ে আনন্দ করার পাশাপাশি তাকে বোঝানো জরুরি যে একটি পরীক্ষার ফল তার পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না। সে কত নম্বর পেয়েছে তার পাশাপাশি সে কী শিখেছে, কী করতে ভালোবাসে এবং ভবিষ্যতে কী হতে চায়, সেসব বিষয়ও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শুধু সাফল্য নয়, পথটাকেও উপভোগ: কোনো লক্ষ্য অর্জনের পর অনেকেই ভাবেন, ‘এবার পরের সাফল্য কী?’ এভাবে এক সাফল্য থেকে আরেক সাফল্যের দিকে ছুটতে থাকলে নিজের অর্জন উপভোগ করার সময়ই পাওয়া যায় না। তাই শুধু শেষ ফলাফলের দিকে তাকিয়ে না থেকে পুরো যাত্রাটাকেও গুরুত্ব দিন। পথে যে বাধাগুলো পেরিয়েছেন, নতুন যে দক্ষতা শিখেছেন কিংবা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন-এসবও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটু বিশ্রাম নেওয়া: এসএসসি শেষ হয়েছে। তাই ফল প্রকাশের পর কিছুটা সময় নিজেকে দেওয়াও দরকার। পর্যাপ্ত ঘুম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, খেলাধুলা কিংবা পছন্দের কোনো কাজে মন দেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা অবশ্যই থাকবে, তবে তার জন্য নিজেকে সারাক্ষণ চাপের মধ্যে রাখার প্রয়োজন নেই।
ভালো ফল উদযাপন করার পাশাপাশি নিজের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিন। আনন্দের দিনেও যদি একটু ভয়, দুশ্চিন্তা বা মন খারাপ আসে; তাহলে সেটিকে ব্যর্থতা ভাবার কারণ নেই। জীবনের একটি পরীক্ষার ফলাফল একটি নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দেয়-সেখান থেকে নিজের মতো করে পথ তৈরি করাটাই আসল সাফল্য। সূত্র: সাইকোলোজি টুডে।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬