এক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘জিআরডব্লিউএম’ (গেট রেডি উইথ মি) মানেই ছিল অফিসে যাওয়া, কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পার্টি কিংবা ডেটে যাওয়ার আগে সাজগোজের ভিডিও। পোশাক বেছে নেওয়া, মেকআপ করা, ব্যাগ গুছিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তের ফাইনাল লুকই থাকত এসব ভিডিওতে। তবে সময়ের সঙ্গে ওই পরিচিত কনটেন্টের ধরন বদলে গেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার বিষয় ‘প্রতিবাদে যাওয়ার প্রস্তুতির জিআরডব্লিউএম’।
বিশেষ করে ভারতের নিট (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এই ট্রেন্ড ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রতিবাদে যাওয়ার প্রস্তুতির পুরো যাত্রাপথ এখন রিল বা ছোট ভিডিওর মাধ্যমে তুলে ধরছেন তরুণ-তরুণীরা।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিকে একেবারে জীবনধারাভিত্তিক ভিডিওর মতো করে তুলে ধরা হচ্ছে। কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দিনের পোশাক বেছে নিচ্ছেন। কেউ আরামদায়ক জুতা পরছেন। কেউ ব্যাগে পানির বোতল, পাওয়ার ব্যাংক, টুপি কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছেন। এরপর শুরু হচ্ছে পোস্টার তৈরির দৃশ্য। হাতে রং-তুলি নিয়ে প্ল্যাকার্ড বানানো, ব্যঙ্গাত্মক লেখা যোগ করা কিংবা মজার ছবি আঁকা-সবই জায়গা পাচ্ছে ভিডিওতে। সবশেষে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিবাদস্থলে পৌঁছে মিছিলে যোগ দেওয়ার দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। ফলে ‘কী পরে যাচ্ছি থেকে’, ‘কেন প্রতিবাদে যাচ্ছি’ তার পুরো গল্পটাই ধরা পড়ছে একটি ভিডিওতে।
প্রতিবাদে জনপ্রিয় গানের ব্যবহার: শুধু জিআরডব্লিউএম নয়, প্রতিবাদের নানা মুহূর্তেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় সংস্কৃতি ব্যবহার করছেন তরুণরা। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে জনপ্রিয় মোবাইল গেম সাবওয়ে সার্ফার্স-এর সঙ্গীত। আবার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান, নাচ কিংবা হাস্যরসাত্মক ভিডিওর ধাঁচেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবাদের রিল। এভাবে বিনোদনের পরিচিত ভাষাকেই আন্দোলনের ভাষায় রূপান্তর করছেন বর্তমান প্রজন্ম।
প্ল্যাকার্ডেও বদলে গেছে ভাষা: আগের দিনের প্রতিবাদী পোস্টারে থাকত দীর্ঘ স্লোগান। এখন তার জায়গা নিয়েছে ছোট, ব্যঙ্গাত্মক এবং সহজে ভাইরাল হওয়ার মতো বাক্য। কেউ লিখছেন,‘আমার আগের সম্পর্কও আমাকে এতা উপেক্ষা করেনি।” আবার কেউ লিখছেন, ‘ডেটিং অ্যাপের মানুষও আমার বার্তার উত্তর এর চেয়ে দ্রুত দেয়।’ জনপ্রিয় সিনেমার সংলাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিমও জায়গা পাচ্ছে পোস্টারে। কোথাও আবার স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান কিংবা ডাইনোসরের পোশাক পরে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রতিবাদ হয়ে উঠছে সৃজনশীল, দৃশ্যমান এবং সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো।
জনপ্রিয় হচ্ছে এই ট্রেন্ড: বর্তমান প্রজন্মের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়েই রয়েছে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অনেকের জন্য এটি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং পেশা ও আয়ের উৎসও। ফলে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তারা নিজেদের কনটেন্টও তৈরি করছেন। এতে একদিকে যেমন আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কনটেন্ট নির্মাতারাও তাদের দর্শকের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছেন। ডিজিটাল বিপণন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ভিডিওর দর্শকসংখ্যা ও অংশগ্রহণ বেশি হয়। ফলে আন্দোলনের খবরও অল্প সময়ের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
একটি প্রতিবাদ এখন শুধু রাস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রতিবাদস্থলে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন। ট্রাইপড, মাইক্রোফোন, গিম্বল কিংবা ড্রোন ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। পরে সেটি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে যে মানুষটি আন্দোলনের স্থানে উপস্থিত থাকতে পারেননি, তিনিও মোবাইল ফোনের পর্দায় পুরো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। জিআরডব্লিউএম এখন শুধু সাজগোজের ভিডিও নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনকে যুক্ত করার নতুন মাধ্যম হিসেবে। সূত্র: এনডিটিভি।
কেএমএএ/আপ্র/২৭.০৭.২০২৬