মহাকাশ বিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর ছায়াপথ মিল্কি ওয়ে-এর কেন্দ্রে ছড়িয়ে থাকা বিশাল এক মহাজাগতিক গ্যাসীয় জালের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির দাবি করা হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, এ মানচিত্রে দেখা গেছে মহাকাশে সুতার মতো সরু কিছু কাঠামো প্রবাহিত হচ্ছে, যা দেখতে অনেকটা মহাকাশে বয়ে চলা নদীর মতো। এসব ‘নদী’ মাঝেমধ্যে এক জায়গায় মিলিত হয়ে উজ্জ্বল মেঘের সৃষ্টি করে, যেখানে নতুন নতুন তারা জন্ম নেয়।
চিলির আলমা টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের গতিপ্রকৃতি ও রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করেছেন। এই অঞ্চল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও শক্তিতে ভরপুর, যা নতুন তারার কাঁচামালের এক বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে।
এ অঞ্চলে ঘন গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ বিরাজ করছে, যেখানে হাইড্রোজেনের আধিক্য বেশি। পাশাপাশি সামান্য পরিমাণ হিলিয়াম ও অন্যান্য উপাদানও রয়েছে। তাপমাত্রা অত্যন্ত শীতল, যা ‘পরম শূন্য’ তাপমাত্রার সামান্য ওপরে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই গ্যাস ও ধূলিকণা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সংকুচিত হয়ে নতুন তারা তৈরি করে।
মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের ‘স্যাজিটেরিয়াস এ’ ব্ল্যাক হোলটি এখানে অবস্থিত। আলমা টেলিস্কোপের মাধ্যমে ছায়াপথের কেন্দ্রের প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। (এক আলোকবর্ষ = এক বছরে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব ≈ ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার)।
জার্মানির ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাশলি বার্নস, যিনি এ গবেষণার প্রধান গবেষকদের একজন, বলেন, ‘এই প্রথম আমরা পুরো অঞ্চলজুড়ে থাকা গ্যাসগুলোকে স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি। ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে গ্যাসের প্রবাহ এবং তারা তৈরি হওয়া ঘন মেঘের যোগসূত্র বোঝা সম্ভব হচ্ছে। একইসঙ্গে তারার বিস্ফোরণ ও বিকিরণ কীভাবে পরিবেশকে নতুন রূপ দিচ্ছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
গবেষণাটি ‘মান্থলি নোটিশেস অফ দ্য রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ জার্নালে ছয়টি বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে।
‘সেন্ট্রাল মলিকিউলার জোন’ নামে পরিচিত এই অঞ্চল পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে এবং ধনু রাশির দিকে অবস্থিত। মানচিত্রে দেখানো এ এলাকা চাঁদের প্রস্থের প্রায় তিন গুণ বড় মনে হবে।
গবেষকরা আলমা টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণের ছবি প্রকাশ করেছেন। অ্যাশলি বার্নস বলেন, ‘ছবিতে শীতল গ্যাস চোখে না দেখলেও রাসায়নিক সংকেত আলাদা আলাদা রং দিয়ে চিহ্নিত করলে অসাধারণ ও জটিল দৃশ্য ফুটে ওঠে। সুতার মতো সূক্ষ্ম কাঠামোগুলি প্রতিটি প্রায় ১০ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত।;
ছবিতে বড় বড় গহ্বর এবং বুদবুদের মতো কাঠামোও দেখা গেছে। বড় সব তারার শক্তিশালী হাওয়া ও সুপারনোভা বিস্ফোরণ এই অদ্ভুত কাঠামোগুলি তৈরি করেছে। তবে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এই অঞ্চলে তারা তৈরি হওয়ার হার প্রত্যাশার তুলনায় কম। স্টিভেন লংমোর, লিভারপুল জন মুরেজ ইউনিভার্সিটি-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকা সত্ত্বেও এখানে তারা তৈরির হার অনেক কম, যা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের একটি বড় রহস্য।’
মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের অবস্থার কারণে গ্যাসের সংকোচন ও চাপ সাধারণ এলাকার তুলনায় বহুগুণ বেশি। বিভিন্ন চৌম্বকক্ষেত্র ও কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোলের বিকিরণ এ অঞ্চলের অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। গ্যাসগুলো শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে, একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, এবং ব্ল্যাক হোল ও আশপাশের তারার মহাকর্ষীয় বলের কারণে এগুলো টেনে ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে বা লম্বা হচ্ছে।
গবেষকরা রাসায়নিক মানচিত্রেও ‘সিলিকন মনোঅক্সাইড’ সহ মিথানল, ইথানল ও অ্যাসিটোনের মতো জটিল জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছেন। লংমোর বলেন, ‘এ অণুর মধ্যে কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড এবং প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের পূর্বসূরী। এত বিপুল পরিমাণে এ অঞ্চলে এ ধরনের অণু থাকা ইঙ্গিত দেয় যে চরম প্রতিকূল পরিবেশেও জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া টিকে রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত জীবন তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’
এই পর্যবেক্ষণ মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রে নতুন তারার জন্ম, গ্যাসের গতিশীলতা এবং চরম পরিবেশে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জটিলতা বোঝার ক্ষেত্রে এক বড় বিজ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/২/২০২৬