পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কি কেবল এই গ্রহেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি তার সূচনা হয়েছিল আরও আগেই, মহাকাশে? সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সেই প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশের শীতল ও বিকিরণপূর্ণ পরিবেশেই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল জৈব অণু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হতে পারে। ফলে মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, তেজস্ক্রিয় বা আয়োনাইজিং বিকিরণের প্রভাবে অ্যামিনো অ্যাসিড একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পেপটাইড বন্ড গঠন করতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিডই প্রোটিনের মৌলিক উপাদান, আর এই পেপটাইড বন্ড তৈরি হওয়াই জটিল প্রোটিন ও এনজাইম গঠনের প্রথম ধাপ। অর্থাৎ, কোষীয় জীবনের রসায়নের ভিত্তি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া মহাকাশেই শুরু হতে পারে।
২০ জানুয়ারি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণা পৃথিবীতে প্রাণের উৎস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান কোথায় এবং কীভাবে চালানো উচিত, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিতে পারে।
পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা জানেন, অ্যামিনো অ্যাসিড, সাধারণ শর্করা ও আরএনএ’র মতো প্রিবায়োটিক অণুর জটিল মিথস্ক্রিয়া থেকেই জীবনের বিকাশ ঘটেছিল। তবে এসব মৌলিক উপাদান প্রথম কোথা থেকে এলো, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ডেনমার্কের আরহাস ইউনিভার্সিটির গবেষক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক আলফ্রেড হপকিনসনের মতে, একটি প্রচলিত ধারণা হলো— এসব অণুর অন্তত কিছু অংশ মহাকাশেই তৈরি হয়েছিল এবং উল্কা বা ধূমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌঁছায়।
গত কয়েক দশকে বিভিন্ন উল্কাপিণ্ড ও ধূমকেতুর নমুনায় গ্লাইসিন নামের সহজতম অ্যামিনো অ্যাসিডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি নাসার ‘ওসাইরিস-রেক্স’ মিশনে গ্রহাণু বেনু থেকে সংগৃহীত ধূলিকণাতেও এর অস্তিত্ব মিলেছে। তবে দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হয়ে তৈরি হওয়া আরও জটিল ডাইপেপটাইড অণু এতদিন মহাকাশে পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাকাশের তীব্র বিকিরণই হয়তো এমন অণু তৈরির সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষক দলটি ল্যাবরেটরিতে মহাকাশের পরিবেশ অনুকরণ করে পরীক্ষা চালায়। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে গ্লাইসিনে ঢাকা বরফ কণার ওপর উচ্চ-শক্তির প্রোটন নিক্ষেপ করা হয়। এরপর উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে দেখা যায়, বিকিরণের প্রভাবে গ্লাইসিন অণুগুলো যুক্ত হয়ে ‘গ্লাইসিলগ্লাইসিন’ নামে একটি ডাইপেপটাইড তৈরি করেছে। এর অর্থ, মহাকাশে স্বাভাবিকভাবেই পেপটাইড বন্ড গঠনের প্রক্রিয়া সম্ভব।
শুধু তাই নয়, পরীক্ষায় আরও কিছু জটিল জৈব অণুর ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি অণু এমন একটি এনজাইমের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ডিএনএ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণের রাসায়নিক ভিত্তি গঠনের একাধিক ধাপ হয়তো পৃথিবীর আগেই, মহাকাশেই সম্পন্ন হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, যদি মহাকাশে এইভাবে নানা ধরনের জৈব অণু তৈরি হয়ে থাকে, তবে আদি পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ আরও সহজ ও দ্রুত হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। ভবিষ্যতে তারা জানতে চান, অন্যান্য অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া কাজ করে কি না। যদি তা প্রমাণিত হয়, তবে মহাকাশে আরও বৈচিত্র্যময় ও জটিল পেপটাইড তৈরির সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে, যা প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে।