বুকের হাড়ের (স্টারনাম) ঠিক নিচে হৃদপিণ্ডের সামনে অবস্থিত ছোট্ট একটি অঙ্গ— থাইমাস গ্রন্থি। একসময় ধারণা করা হতো, শৈশবের পর এই অঙ্গের কার্যকারিতা প্রায় শেষ হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘায়ু ও শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে এই গ্রন্থির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাইমাস ধীরে ধীরে সংকুচিত হয় এবং নতুন টি-সেল তৈরির ক্ষমতা কমে যায়। টি-সেল হলো এমন এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা, যা সংক্রমণ ও ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ইমিউনিটি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনের অধ্যাপক পাওলা বনফান্তি জানিয়েছেন, শৈশব থেকেই থাইমাস সংকুচিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বয়ঃসন্ধির পর তা আরো দ্রুত ঘটে। এর ফলে নতুন টি-সেল উৎপাদন কমে গিয়ে বয়সের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হতে থাকে।
গবেষণায় কী মিলেছে?
চলতি বছরের মার্চে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে হাজারো সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যাদের থাইমাস তুলনামূলকভাবে সুস্থ, তাদের মৃত্যুঝুঁকি কম এবং হৃদরোগ ও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও অপেক্ষাকৃত কম।
একই সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতার সঙ্গে থাইমাসের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক থাকতে পারে। কারণ, এই চিকিৎসা রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এছাড়া ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে থাইমাস অপসারণ করা হয়েছে, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
সতর্ক করছেন গবেষকেরা
তবে গবেষকরা বলছেন, এসব ফলাফল এখনো থাইমাস সুস্থ থাকলেই আয়ু বাড়ে— এমন নিশ্চিত প্রমাণ নয়। অধ্যাপক পাওলা বনফান্তির ভাষায়, এটি মূলত একটি সম্পর্ক (অ্যাসোসিয়েশন), কারণ-ফল নয়। অর্থাৎ, সুস্থ মানুষের থাইমাস স্বাভাবিকভাবেই ভালো থাকতে পারে; তাই থাইমাসই দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।
তার মতে, থাইমাসের কার্যকারিতা ধরে রাখা নতুন টি-সেল তৈরিতে সহায়ক এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি মানুষের আয়ু কতটা বাড়াতে পারে, তা জানতে আরো বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
কেন এতদিন গুরুত্ব পায়নি?
দীর্ঘদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে মনে করা হতো, বয়ঃসন্ধির পর থাইমাস প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে জানা গেছে, বয়স বাড়লেও অঙ্গটি পুরোপুরি অকার্যকর হয় না। বরং এর সক্রিয় টিস্যুর জায়গায় ধীরে ধীরে চর্বি ও সংযোজক টিস্যু জমা হয়, ফলে কার্যক্ষমতা কমে যায়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষকেরা এখন থাইমাসকে পুনরুজ্জীবিত করার উপায় নিয়ে কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক প্রতিষ্ঠান টলারেন্স বায়ো এমন একটি অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ করছে, যা থাইমাসের সংকোচন প্রক্রিয়া ধীর করতে পারে। আগামী বছর এটির মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের চিকিৎসা সফল হলেও তা প্রথমে দীর্ঘায়ুর উদ্দেশ্যে নয়, বরং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেই ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি।
সূত্র: নেচার সাময়িকী, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল গবেষণা প্রতিবেদন ও আল-জাজিরা।
এসি/আপ্র/২৭/০৭/২০২৬