ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
রাতে স্বামী বা স্ত্রী প্রচণ্ড নাক ডাকেন। মাঝে মধ্যে হঠাৎ শব্দ থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর দমবন্ধ মানুষের মতো হাঁ করে শ্বাস নেন, আবার নাক ডাকা শুরু হয়। সকালে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমি তো বেশ ভালোই ঘুমিয়েছি!’ আসলে এই নীরব বিরতিগুলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এটি এমন একটি সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে গলার পেছনের অংশ বারবার বন্ধ হয়ে শ্বাস কমে যায় বা সাময়িকভাবে থেমে যায়। রোগী সাধারণত নিজে ঘটনাটি বুঝতে পারেন না; প্রথম সন্দেহ করেন তার পাশে ঘুমানো মানুষ।
ঘুমের মধ্যে কী ঘটে: জেগে থাকার সময় গলার পেশিগুলো শ্বাসনালি খোলা রাখে। ঘুমের মধ্যে এসব পেশি কিছতা শিথিল হয়। কারও জিহ্বা, নরম তালু বা গলার টিস্যু পেছনে সরে শ্বাসনালি সংকুচিত বা বন্ধ করে দিতে পারে। তখন শরীরে অক্সিজেন কমে যায়। মস্তিষ্ক বিপদের সংকেত পেয়ে রোগীকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আংশিক জাগিয়ে তোলে। শ্বাস আবার শুরু হয়; কিন্তু কিছুক্ষণ পর একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে। গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে এক রাতে শত শতবার ঘুম ভেঙে গেলেও সকালে তার কিছুই মনে থাকে না। ফলে বিছানায় সাত-আট ঘণ্টা থাকার পরও শরীর গভীর ও স্বস্তিদায়ক ঘুম পায় না।
সব নাক ডাকাই কি স্লিপ অ্যাপনিয়া: না। নাক ডাকার সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্পর্ক থাকলেও সব নাক ডাকা রোগ নয়। আবার স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলেও সবাই খুব জোরে নাক ডাকেন না। যেসব লক্ষণ একসঙ্গে থাকলে সন্দেহ বাড়ে, তা হলো জোরে ও নিয়মিত নাক ডাকা; ঘুমের মধ্যে শ্বাস থেমে যাওয়া; দম আটকে বা হাঁপাতে হাঁপাতে জেগে ওঠা; সকালে মুখ শুকিয়ে থাকা বা মাথাব্যথা; পর্যাপ্ত ঘুমের পরও দিনের বেলা ঘুম পাওয়া; মনোযোগ, স্মৃতি বা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া; মেজাজ খিটখিটে থাকা; রাতে বারবার প্রস্রাব করতে ওঠা; যৌন আগ্রহ বা সক্ষমতা কমে যাওয়া।
নারীদের ক্ষেত্রে সব সময় জোরে নাক ডাকা প্রধান অভিযোগ নাও হতে পারে। তারা অনিদ্রা, ক্লান্তি, সকালে মাথাব্যথা বা মন-মেজাজের সমস্যার কথা বেশি বলতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চঞ্চলতা, স্কুলে মনোযোগের সমস্যা, বিছানায় প্রস্রাব এবং বড় টনসিল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট (এনএইচএলবিআই) ৯ জানুয়ারি ২০২৫-এ হালনাগাদ তথ্যে এসব ভিন্ন উপসর্গের কথা উল্লেখ করেছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে: স্থূলতা একটি বড় ঝুঁকি: কিন্তু রোগটি শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষের হয় না। বয়স বৃদ্ধি, পুরুষ লিঙ্গ, পরিবারের ইতিহাস, মোটা ঘাড়, বড় জিহ্বা বা টনসিল এবং চোয়ালের গঠনও ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির দুর্বলতা, থাইরয়েডের সমস্যা, ধূমপান এবং অ্যালকোহল ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ঘুমের আগে অ্যালকোহল বা ঘুমের কিছু ওষুধ গলার পেশিকে আরও শিথিল করে সমস্যা বাড়াতে পারে।
আরেক ধরনের রোগ হলো সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া। এতে শ্বাসনালি বন্ধ হওয়ার বদলে মস্তিষ্ক থেকে শ্বাস নেওয়ার নির্দেশ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা, স্ট্রোক, স্নায়ু-পেশির কিছু রোগ এবং দীর্ঘদিন ওপিওয়েডজাতীয় ব্যথানাশক ব্যবহারের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
চিকিৎসা না করলে কী ক্ষতি: প্রতিবার অক্সিজেন কমা এবং ঘুম ভেঙে যাওয়ার সময় শরীরে চাপের হরমোন বাড়ে। রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দনে ওঠানামা হয়। দীর্ঘদিন চললে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন, স্ট্রোক এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পাওয়াও ছোট সমস্যা নয়। গাড়ি চালাতে বা যন্ত্র পরিচালনা করতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডের অনিচ্ছাকৃত ঘুম প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালালে মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তাই গাড়ি চালানোর সময় চোখ বন্ধ হয়ে আসা, বারবার হাই ওঠা বা রাস্তার কোনো অংশ মনে না থাকা—এসব দেখা দিলে গাড়ি নিরাপদ স্থানে থামাতে হবে। জানালা খুলে বা জোরে গান চালিয়ে ঘুম কাটানোর চেষ্টা নিরাপদ সমাধান নয়।
রোগ নির্ণয় হয় কীভাবে: শুধু নাক ডাকার রেকর্ডিং, স্মার্টওয়াচ বা অক্সিজেন মাপার যন্ত্র দেখে চূড়ান্ত রোগনির্ণয় করা যায় না। চিকিৎসক উপসর্গ, ঘুমের অভ্যাস, ওজন, গলার গঠন, ওষুধ এবং অন্যান্য রোগ সম্পর্কে জানবেন। পরিবারের সদস্যের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। রোগ নির্ণয়ের প্রধান পরীক্ষা হলো স্লিপ স্টাডি। ঘুমের পরীক্ষাগারে পলিসমনোগ্রাফিতে শ্বাসপ্রবাহ, অক্সিজেন, হৃদ্স্পন্দন, মস্তিষ্কের তরঙ্গ ও শরীরের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। নির্বাচিত ও জটিলতাহীন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশে বাড়িতে হোম স্লিপ অ্যাপনিয়া টেস্ট করা যায়।
আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের নির্দেশনা অনুযায়ী, উপসর্গহীন মানুষের সাধারণ স্ক্রিনিংয়ের জন্য হোম টেস্ট করা উচিত নয়। সন্দেহ প্রবল থাকা সত্ত্বেও একটি হোম টেস্ট স্বাভাবিক, অসম্পূর্ণ বা কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ হলে পরীক্ষাগারে স্লিপ স্টাডি প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসা মানেই কি সারা জীবন সিপিএপি: সবার চিকিৎসা এক নয়। রোগের তীব্রতা, শারীরিক গঠন, উপসর্গ ও অন্য রোগের ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। ওজন বেশি থাকলে ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করা, অ্যালকোহল সীমিত করা, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পিঠের বদলে কাত হয়ে ঘুমানো উপকারী হতে পারে। তবে গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়ায় শুধু ওজন কমার অপেক্ষায় চিকিৎসা বিলম্ব করা ঠিক নয়।
সিপিএপি যন্ত্র মাস্কের মাধ্যমে হালকা বায়ুচাপ দিয়ে শ্বাসনালি খোলা রাখে। এটি সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর চিকিৎসাগুলোর একটি। প্রথমদিকে মাস্কে অস্বস্তি, নাক বন্ধ বা মুখ শুকানোর সমস্যা হলে যন্ত্রটি ছেড়ে না দিয়ে মাস্কের ধরন, আর্দ্রতা ও চাপ সমন্বয়ের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। সিপিএপি ব্যবহারের পর ঘুমের মান, নাক ডাকা ও দিনের তন্দ্রা দ্রুত কমতে পারে।
সিপিএপি সহ্য না হলে বা নির্বাচিত হালকা থেকে মাঝারি রোগে প্রশিক্ষিত দন্তচিকিৎসকের তৈরি মুখের বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু রোগীর টনসিল, চোয়াল বা শ্বাসনালির গঠন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার কিংবা হাইপোগ্লোসাল নার্ভ স্টিমুলেশন বিবেচনা করা হয়। স্থূলতার সঙ্গে মাঝারি বা গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওজন কমানোর ওষুধও কোনো কোনো রোগীর সমন্বিত চিকিৎসার অংশ হতে পারে।
চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: উচ্চ রক্তচাপ একাধিক ওষুধেও নিয়ন্ত্রণে না আসা, স্থূলতা, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন, রাতে অক্সিজেন কমে যাওয়া অথবা দিনের তন্দ্রা থাকলে ঘুম সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা দরকার। স্টপ-ব্যাংয়ের মতো প্রশ্নমালা ঝুঁকি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। কিন্তু নিজে রোগনির্ণয় করে না। পরীক্ষার ফলকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাগত মূল্যায়নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
শেষ কথা: নাক ডাকার শব্দে পরিবারের ঘুম নষ্ট হয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, নাক ডাকার মাঝের নীরবতা।
মনে রাখুন, শব্দটি বিরক্তিকর হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ শব্দ থেমে শ্বাসও থেমে গেলে সেটি শরীরের সাহায্য চাওয়ার সংকেত। ভালো ঘুম বিলাসিতা নয়; হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও নিরাপদ জীবনের প্রয়োজন।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা যুক্ত রাষ্ট্র এবং শিক্ষক, গবেষক, কলামিস্ট ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬