ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই; বরং বাড়ছে প্রাণহানি ও হাসপাতালে রোগীর চাপ। এক দিনে ডেঙ্গুতে আরো ১০ জনের মৃত্যু এবং নতুন করে ১ হাজার ৯৪৩ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩১-এ পৌঁছেছে বলে ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবরেই মারা গেছেন ৮৬ জন। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে দেওয়া ভিডিওবার্তায় তিনি বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ওই মাসে মারা যান ১৪৮ জন। চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরেই সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন বিভাগে রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির তথ্য থেকে স্পষ্ট, সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এক দিনের হিসাবেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১৭৭ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ২৩৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এই দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩২ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে বরিশালে ১৯৫, চট্টগ্রামে ২৫৬, খুলনায় ২৩৪, ময়মনসিংহে ১০০, রাজশাহীতে ২৩০, রংপুরে ৭০ এবং সিলেটে ১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ রাজধানীর বাইরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারজন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় তিনজন, চট্টগ্রাম বিভাগে দুজন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য এলাকায় একজন রয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৮০৩ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৩১ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভিডিওবার্তায় তিনি প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় দিয়ে নিজেদের বাড়ি, আশপাশের এলাকা এবং চলাচলের পথ পরিষ্কারের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জমে থাকা পানি ও আবর্জনা এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি করে। এসব স্থান পরিষ্কার করা গেলে মশার বংশবিস্তার রোধ করা অনেক সহজ হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারকে সহযোগিতা করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে ১৩ অক্টোবর ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী পাড়া-মহল্লায় মাইকে প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং জুমার নামাজের খুতবায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা প্রচারের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারি আবাসিক এলাকা ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রতিরোধে অবহেলার সুযোগ নেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম প্রয়োজন। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টায়ার কিংবা অন্য কোনো স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা নয়, নিয়মিত নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো পরিষ্কার রাখাও জরুরি।
জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে গেলেই যে রোগীর ঝুঁকি কেটে গেছে, এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণও অপরিহার্য। বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। মৃত্যুর সংখ্যা ও হাসপাতালে রোগীর চাপ যে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা থেকে উত্তরণে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রমে আর দেরি করার সুযোগ নেই।
সানা/আপ্র/১৫/১০/২০২৬