সরকারি হাসপাতালের ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নের নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। পর্দা কেনায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়, ওসিসি ও স্টেশনারি খাতে ৩৫ লাখ টাকার ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ঘিরে উঠে এসেছে নানা অসঙ্গতির চিত্র। আজকের প্রত্যাশার জেলা প্রতিনিধি এস এ খান শিল্টুর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওসিসি ও স্টেশনারি সামগ্রী ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবির, প্রধান অফিস সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটন ও স্টোরকিপার পলি খাতুন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ওসিসি ও স্টেশনারি খাতে ৩৫ লাখ টাকার মালামাল সরবরাহের কাজ ইজিপি প্রক্রিয়ায় পায় মেহেরপুর ট্রেডিং। তবে অর্থবছর শেষ হলেও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে মাত্র দুই দফায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মালামাল গ্রহণ করা হয়েছে। বাকি প্রায় ২৬ লাখ টাকার সামগ্রী অন্য প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পর্দা ক্রয়ে ২০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে পাশ কাটিয়ে চার সদস্যের একটি ক্রয় কমিটির মাধ্যমে ঢাকার এক ঠিকাদারের কাছ থেকে পর্দা কেনা হয়।
ক্রয় কমিটিতে যারা ছিলেন
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই কমিটিতে ছিলেন—
* সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবির
* ডা. আবুল কাশেম
* ডা. আমেনা খাতুন
* ডা. হাসিবুল ইসলাম
তবে কতটি পর্দা কেনা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দিতে পারেননি।
অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে
হাসপাতালের নতুন ভবনে অনুসন্ধান করে প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০টি পর্দা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী প্রতিটি পর্দার দাম সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হতে পারে বলে বাজার দও অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে।
সে হিসাবে পর্দার মোট মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ লাখ টাকা। পাইপ, ফিটিংস ও মিস্ত্রি খরচ যোগ করলেও মোট ব্যয় আনুমানিক ৬ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ সরকারি নথিতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
তবে প্রকৃত ব্যয়ের সঠিক হিসাব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকাদারের অভিযোগ
মেহেরপুর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দেবাশীষ বাগচি বলেন, ‘আমরা ৩৫ লাখ টাকার কাজ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে মাত্র ৯ লাখ টাকার মালামাল নেওয়া হয়েছে। বাকি মালামাল নেওয়া হয়নি। ইজিপিতে পাওয়া কাজ অন্য কোনো ঠিকাদার করার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলেও তাকে বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
স্টোরকিপার ও বড়বাবুর বক্তব্য
স্টোরকিপার পলি খাতুন বলেন, ‘নতুন ভবনের জন্য ২০ লাখ টাকার পর্দা কেনা হয়েছে। বড়বাবু বিল তৈরি করেছেন। আমি শুধু স্টোরকিপার হিসেবে মালামাল বুঝে নিয়েছি। কোন ঠিকাদারের কাছ থেকে কেনা হয়েছে, আমি তাকে চিনি না।’
প্রধান অফিস সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘হাসপাতালের বস হচ্ছেন সুপার। তিনি যেভাবে নির্দেশ দেন, আমরা সেভাবেই কাজ করি। সাবেক সুপার নিজস্ব ক্ষমতাবলে ২০ লাখ টাকার পর্দা কিনেছেন। স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কেনা হয়েছে, আমরা শুধু আদেশ বাস্তবায়ন করেছি।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়কের ব্যাখ্যা
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘উপযোজন প্রক্রিয়ায় ক্রয় কমিটির মাধ্যমে স্টেশনারি সামগ্রী কেনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি হাসপাতালে রয়েছে। ঠিকাদার বিষয়টি জানেন। আমার পরে যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি বাকি অর্থ সমন্বয় করে থাকতে পারেন।’
তদন্তের আশ্বাস
মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি ও মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান বলেন, ‘হাসপাতালের অনিয়মের বিষয়ে অবশ্যই অনুসন্ধান করা হবে। কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা রাখতে চাই না।’
সরকারি জেলা হাসপাতালগুলোতে স্টেশনারি, ওসিসি ও অন্যান্য খাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং মেহেরপুর হাসপাতালের এই ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি ক্রয়বিধির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা এখন তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
সানা/আপ্র/৩/৮/২০২৬