দেশের সুশীল সমাজের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তাঁর মতে, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং সংস্কারের নামে বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা সেকুলার সমাজকে এর খেসারত দিতে বাধ্য করবে। একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজও।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে ‘জুলাই পরবর্তী রাজনীতির আজব দশা’ শিরোনামে নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির এই নেতা।
পোস্টে মাহফুজ আলম লেখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সেকুলার সুশীল সমাজ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জামায়াত-শিবির এবং ’৭২-পরবর্তী অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির কাছে নতজানু হতে দেখেছেন তিনি। ক্ষমতার জন্য এবং সংস্কারের নামে বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জামায়াত-শিবিরের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এসব ব্যক্তির অনেকে সাংস্কৃতিকভাবে আওয়ামী লীগ ঘরানার হলেও বিএনপিকে নিজেদের রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না।
মাহফুজের মতে, জামায়াত-শিবিরের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ার পর অনেকে সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। এ কারণে এখনো তাঁদের একটি অংশ ওই রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
ডিজিটাল মাধ্যমে সংগঠিত চাপ ও প্রচারণার প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, ডিজিটাল ‘মবের চাপে’ অনেকে ডানপন্থা থেকে উগ্র ডানপন্থায় চলে গেছেন। এ ধরনের তৎপরতাকে তিনি পরিকল্পিত অপপ্রচার ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ধ্বংসের কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেন।
মাহফুজ আলম লেখেন, এসব তৎপরতা এড়িয়ে চলার সুযোগ সহজে নেই। তাঁর আশঙ্কা, দেশ ইতোমধ্যে উগ্র ডানপন্থার পথে এগিয়ে গেছে। বিভিন্ন ধারার নরম ও কঠোর ডানপন্থি শক্তি মিলে এ প্রবণতাকে আরো নিশ্চিত করবে।
জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সুশীল সমাজের একাংশের ঘনিষ্ঠতার পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, সংস্কারের নামে কিংবা ক্ষমতার স্বার্থে বিএনপির বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের কাছে যাওয়ার খেসারত সেকুলার সমাজকে দিতেই হবে। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজকেও জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করার মূল্য দিতে হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মাহফুজের ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে লাভবান হবে জামায়াত-শিবির; নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পর সুশীল সমাজের সংশ্লিষ্ট অংশ ও ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ - উভয় গোষ্ঠীকেই পরিত্যক্ত হতে হতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পান।
তাঁদের মধ্যে মাহফুজ আলম প্রথমে উপদেষ্টা পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে গত ফেব্রুয়ারিতে নাহিদ ইসলাম উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক হলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মাহফুজ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন, গত ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। এরপর নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভোটের মাঠে দেখা যায়নি। তবে গত মার্চে, সংসদ নির্বাচনের পরের মাসে ‘অল্টারনেটিভস’ নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবারো রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। তরুণদের রাজনীতিতে ইতিবাচক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক নেত্রী তাজনূভা জাবীন।
সানা/আপ্র/১৬/১০/২০২৬