এম এম মুসা======
একটি প্রশ্ন করা যাক। খুব সহজ প্রশ্ন। বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি হলে টাকা যাবে কার পকেটে? টাকা আসবে কার পকেট থেকে? এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই আসল ছবি বোঝা যায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস এই হিসাব একবার নয়, বারবার দেখিয়ে দিয়েছে। শুধু হিসাবটা এতদিন আলাদা আলাদা খাতায় লেখা ছিল। কখনো বিদ্যুৎ উৎপাদনের খাতায়। কখনো রান্নার গ্যাসের খাতায়। এবার একসঙ্গে পড়া দরকার। কারণ তিন খাতার সংখ্যা মেলালে একটাই ছবি ফুটে ওঠে।
কুইক রেন্টালের ইতিহাস: ২০০৯ সাল নাগাদ তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ পাস করে, যা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই স্বল্পমেয়াদি ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করার অনুমতি দেয় এবং এই সিদ্ধান্তগুলোকে আদালতে চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে রাখে। জরুরি সমাধান হিসেবে চালু হওয়া এই কেন্দ্রগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর নামে একটি স্থায়ী আর্থিক দায়ে পরিণত হয়। অর্থাৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক অর্থবছরে তা ৩২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার এ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে, যার সিংহভাগ ব্যয় হয় কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোতে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে পিডিবির মোট বিদ্যুৎ ক্রয়-ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ, যার পরিমাণ ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতিহাসের কাঠামোগত মিল: উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তির সূচনাবিন্দু একই-‘সরকার এই কাজ কার্যকরভাবে করতে পারছে না, তাই বেসরকারি খাতকে দিতে হবে’। এই যুক্তি ভুল নয়, কিন্তু তা প্রায়ই বিকল্প সমাধান (যেমন অভ্যন্তরীণ সংস্কার, ব্যবস্থাপনা চুক্তি) খতিয়ে না দেখেই সরাসরি মালিকানা হস্তান্তরের দিকে ঠেলে দেয়।
উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক, আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে সীমিত ও অস্বচ্ছ নির্বাচন-প্রক্রিয়ার আভাস পাওয়া যায়- কুইক রেন্টালের ক্ষেত্রে তা ছিল আইন করে দরপত্র এড়ানো, আজকের ক্ষেত্রে তা ‘স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের’ কাছ থেকে সরাসরি প্রস্তাব আহ্বান, যার যোগ্যতা-মানদণ্ড এখনও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক, ঝুঁকি বণ্টনের কাঠামোগত প্যাটার্নেও মিল আছে। কুইক রেন্টাল ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীর আয় বাজারের চাহিদা বা কর্মক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল না-ক্যাপাসিটি চার্জ নিশ্চিত ছিল, ঝুঁকি পুরোপুরি রাষ্ট্র ও ভোক্তার ওপর চাপানো হয়েছে। বিতরণ ব্যবসায় যদি শুল্কহার এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বেসরকারি অপারেটরের একটি নিশ্চিত মুনাফার হার থাকে, অথচ প্রকৃত দক্ষতা বা সেবার মানের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুর্বল থাকে, তাহলে একই কাঠামোগত সমস্যা-ঝুঁকিহীন মুনাফা, ভোক্তার ওপর চাপ-নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।
বিতরণ ব্যবসা উৎপাদনের চেয়েও বেশি স্পর্শকাতর: উৎপাদন কেন্দ্রগুলো তাদের বিদ্যুৎ বিক্রি করে একটিমাত্র পাইকারি ক্রেতা-পিডিবির কাছে; সাধারণ গ্রাহকের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু বিতরণ কোম্পানি সরাসরি প্রতিটি পরিবার, দোকান ও কারখানার সঙ্গে সম্পর্কিত-মিটার রিডিং, বিল তৈরি, সংযোগ-বিচ্ছিন্নকরণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সবকিছুর জন্য গ্রাহকের কাছে এটিই একমাত্র জানালা, এবং গ্রাহকের সরবরাহকারী বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে এখানে ব্যর্থতার সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি এবং তাৎক্ষণিক।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো উচ্চ-আদায়ক্ষম শহুরে এলাকা লাভজনক, কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) আওতাধীন কোটি কোটি গ্রামীণ গ্রাহক-যাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কম, বিল আদায়ের ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং ভর্তুকির প্রয়োজন বেশি-তাদের এলাকা মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে কম আকর্ষণীয়। নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, লাভজনক ও অলাভজনক এলাকার মধ্যে বৈষম্য বেসরকারিকরণের পর আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে যদি শহুরে লাভজনক সংস্থাগুলো (যেমন ডেসকো, ডিপিডিসি) আগে বেসরকারি করা হয় আর গ্রামীণ, লোকসানি অংশ রাষ্ট্রের ঘাড়ে থেকে যায়, তাহলে ক্রস-সাবসিডির যে ব্যবস্থায় শহরের রাজস্ব দিয়ে গ্রামের ঘাটতি পোষানো হতো, তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এলপিজি বাজার: প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও নিয়মে চলে না: বাংলাদেশের এলপিজি বাজার গত দেড় দশকে কয়েক গুণ বড় হয়েছে এবং বর্তমানে এই বাজারের আটানব্বই শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে, প্রায় দশটি বড় কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে। এটি এমন একটি বাজার, যেখানে একাধিক বিক্রেতার প্রতিযোগিতাই দামকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে বারো কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ দাম ঘোষণা করে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে এর চেয়ে বেশি দামে কোথাও বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিশন দাম নির্ধারণ করে ১৩৪১ টাকা, অথচ সরবরাহ-সংকটের অজুহাতে বাজারে প্রতি সিলিন্ডারে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা বেশি নেওয়া হয়। এপ্রিলে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৭২৮ টাকা, তবু নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার মেলেনি বলে অভিযোগ ওঠে। জুলাইয়ে সরকার দাম নির্ধারণ করে ১৫২৮ টাকা, অথচ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় তা তিনশ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। যখন বাজারের প্রায় সব প্রতিযোগী ব্র্যান্ড একযোগে নির্ধারিত দাম উপেক্ষা করে প্রায় একই পরিমাণ বেশি দাম রাখে, তখন তা নিছক সরবরাহ-সংকট নয়-বরং একটি কাঠামোগত বাজার-ব্যর্থতার লক্ষণ, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তা মূল্য-শৃঙ্খলা আনতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারছে না।
একচেটিয়া বাজারে কী হবে? এলপিজির বাজারে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে ভোক্তার সামনে দশটি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড আছে, একাধিক দোকান আছে, এবং কেউ চাইলে অন্তত ভিন্ন দোকানে বা ভিন্ন ব্র্যান্ডে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। অথচ এই ন্যূনতম প্রতিযোগিতা-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিইআরসি-র মাসিক মূল্য-আদেশ কার্যকর করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিতরণ এর ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থিত একটি ব্যবসা। একটি নির্দিষ্ট এলাকায়-ধরা যাক ডিপিডিসি বা ডেসকোর কোনো সাবেক অঞ্চল যদি একটি বেসরকারি কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত হয়-সেই এলাকার প্রতিটি গ্রাহকের জন্য একটিমাত্র তার-সংযোগ, একটিমাত্র মিটার, একটিমাত্র বিল প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থাকবে। এলপিজির মতো একটি বহু-বিক্রেতা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সরকারের মাসিক মূল্য-আদেশ নিয়মিতভাবে উপেক্ষিত হয়, তাহলে একটি সম্পূর্ণ একচেটিয়া, বিকল্পহীন বাজারে একই নিয়ন্ত্রক সংস্থা কীভাবে শুল্কহার, সংযোগ-মাশুল ও সেবার মান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করবে?
মিলটা কোথায়, স্পষ্ট করে বলা যাক: তিনটি খাত। একটাই কাঠামো। দাম বা শর্ত ঠিক করে রাষ্ট্র বা নিয়ন্ত্রক। মেনে চলা বা না চলার সিদ্ধান্ত নেয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রয়োগের ক্ষমতা দুর্বল। শাস্তি লঘু বা অনুপস্থিত। ফল একটাই। ব্যয় বাড়ে গ্রাহকের। মুনাফা বাড়ে মালিকের। এই কাঠামো বদলায়নি একবারও। শুধু পণ্য বদলেছে। কখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন। কখনো রান্নার গ্যাস। কখনো বিদেশের বিতরণ কোম্পানি। নাম আলাদা। হিসাব একই।
বিতরণে এই হিসাব কেমন দাঁড়াবে? বিদ্যুৎ বিতরণে গ্রাহক সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। প্রতিটি বাড়ি। প্রতিটি দোকান। প্রতিটি কারখানা। কেউ সংযোগ ছাড়া চলতে পারে না। কোম্পানি বদলানোরও উপায় নেই। যদি শুল্কহারে সামান্যও বাড়তি যোগ হয়, তার প্রভাব পড়বে প্রতিটি বিলে। কোটি কোটি গ্রাহকের সম্মিলিত বাড়তি ব্যয় হয়ে উঠবে বিশাল অঙ্ক। লাভবান হবে হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ঠিক যেমনটা হয়েছে রেন্টালে। ঠিক যেমনটা হচ্ছে এলপিজিতে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক গ্রাহক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারণ তাদের এলাকা কম লাভজনক। ক্রস-সাবসিডি ভেঙে পড়লে বোঝা বাড়বে তাদেরই। শহরের গ্রাহক পাবেন দ্রুত সেবা। গ্রামের গ্রাহক পড়ে থাকবেন অবহেলায়।
শেষ কথা: হিসাব আগে, স্বাক্ষর পরে: সিদ্ধান্তের আগে হিসাবটা প্রকাশ্যে হওয়া দরকার। কে কত মুনাফা করবে? কে কত বাড়তি দেবে? কোন প্রক্রিয়ায় বাড়তি ঠেকানো হবে? ব্যর্থ হলে শাস্তি কী? এই চার প্রশ্নের স্পষ্ট, প্রকাশ্য উত্তর ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা উচিত নয়। রেন্টাল ও এলপিজির অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তর ছাড়া এগোলে মূল্য গোনে সাধারণ মানুষ। বিদেশের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। বিদ্যুৎ বিতরণে একই ভুলের সুযোগ নেই। কারণ এবার বাজি কোটি কোটি মানুষের মাসিক ব্যয়ে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
সানা/আপ্র/২৯/৭/২০২৬