দেশে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) সংসদে ‘সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয়’ বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে প্যানিক বায়িং ও অবৈধ মজুদ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে। এর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে পড়েছে।
কমিটি জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি করে অন্তত তিন মাসের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা তৈরির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা না থাকায় আমদানি ব্যাহত হলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে ঢাকা–চট্টগ্রাম পাইপলাইন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি পণ্য আমদানিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
ছাদে বাধ্যতামূলক সৌর প্যানেল স্থাপন এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকির সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে সিস্টেম লস কমানো এবং তেল, গ্যাস, কয়লা, সৌর ও বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন উৎস সমন্বিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিরোধী দলের সদস্যদের ১০ দফা সুপারিশও যুক্ত করা হয়। সেখানে ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সমীক্ষার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভিন্নমত তুলে ধরা হয়।
বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের ব্যবধান প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সর্বোচ্চ উৎপাদন সাধারণত ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
বিরোধী পক্ষের সুপারিশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, গ্যাস কূপের ওয়ার্কওভার, দ্রুত ফলদায়ক কূপে বিনিয়োগ, গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি স্থল ও সাগরে আন্তর্জাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমান প্রায় এক শতাংশ থেকে অন্তত দশ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশও করা হয়েছে। এজন্য নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, ব্যাটারি স্টোরেজ সংযোজন এবং যন্ত্রপাতির ওপর কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়, সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন, বহুমুখী জ্বালানি উৎস এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা জরুরি।
সানা/আপ্র/৮/৬/২০২৬