অধ্যাপক ডা. এম আলী
হাঁটু আমাদের শরীরের অন্যতম জটিল এবং ভার বহনকারী একটি সন্ধি, যা ঊরুর হাড় বা ফিমার, পায়ের নিচের হাড় টিবিয়া এবং হাঁটুর ঢাকনা বা প্যাটেলার সমন্বয়ে গঠিত।
ট্রমা বা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যখন এই সন্ধি বা এর আশপাশের অংশ ভেঙে যায়, তখন তাকে হাঁটুর জটিল ফ্র্যাকচার বলা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া বা মারাত্মক কোনো খেলার আঘাত এসব জটিলতার প্রধান কারণ। সাধারণ ফ্র্যাকচারের মতো এগুলো কেবল একটি সরল রেখায় ভাঙে না, বরং হাড়গুলো টুকরো টুকরো হয়ে সন্ধির ভেতরের মসৃণ তরুণাস্থি বা আর্টিকুলার কার্টিলেজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রোগীর চলাফেরার সক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং দ্রুত সঠিক চিকিৎসা না করালে পরবর্তী সময়ে অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাঁটু ক্ষয়রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হাঁটুর ট্রমা ম্যানেজমেন্টের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো সঠিক ও দ্রুত রোগ নির্ণয়। রোগীর শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি এক্স-রে এবং থ্রি-ডি সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফ্র্যাকচারের মাত্রা ও হাড়ের টুকরোগুলোর সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। জটিল এসব ফ্র্যাকচারের চিকিৎসায় গতানুগতিক কাস্ট বা প্লাস্টার সবসময় কার্যকর হয় না। আধুনিক অর্থোপেডিক সার্জারিতে অ্যানাটমিক্যাল প্লেট, বিশেষ স্ক্রু এবং এক্সটার্নাল ফিক্সটরের সাহায্যে হাড়ের টুকরোগুলো নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। একে ওপেন রিডাকশন অ্যান্ড ইন্টারনাল ফিক্সেশন বা ওরিফ বলা হয়। আমাদের লক্ষ্য থাকে হাড়ের মূল আকৃতি ও জোড়ার মসৃণতা ফিরিয়ে আনা, যাতে রোগী ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে পা ভাঁজ করতে পারেন এবং হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পান। তবে কেবল সফল অস্ত্রোপচারই শেষ কথা নয়; ট্রমা ম্যানেজমেন্টের একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন বা রিহ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়া। অস্ত্রোপচারের পরপরই ফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে হাঁটুর নাড়াচাড়া বা রেঞ্জ অব মোশন শুরু করতে হয়, যাতে জোড়া শক্ত বা স্টিফ হয়ে না যায়।
পেশির শক্তি বাড়াতে এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে থেরাপিস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় রোগীর বয়স, শারীরিক সুস্থতা এবং আঘাতের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কয়েক মাস থেকে শুরু করে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রোগী ও চিকিৎসকের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং ট্রমা পরবর্তী সঠিক পরিচর্যাই পারে একজন মানুষকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে। দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং কর্মক্ষেত্রে ও খেলাধুলায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত। আর দুর্ভাগ্যবশত যদি এমন জটিল আঘাত লেগেই যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক ট্রমা সার্জনের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, আধুনিক সার্জিক্যাল পদ্ধতি এবং নিয়মতান্ত্রিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেই কেবল একজন মানুষ তার হাঁটুতে ফিরে পেতে পারেন পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সচেতন থাকুন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন।
লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর, অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমা ডিপার্টমেন্ট অ্যান্ড জয়েন্ট কেয়ার অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টার, এভারকেয়ার হাসপাতাল, বসুন্ধরা, ঢাকা
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬